জুবায়ের আহমাদ জুয়েল (কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি): , আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০২৬ , আজকের সময় : শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০২৬

তাড়াইলে মাদকের সয়লাব: অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম

কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলা বর্তমানে মাদকের ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত। একসময় সীমিত পরিসরে থাকা মাদক সমস্যা এখন পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সহজলভ্য হয়ে ওঠায় শুধু নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত ও স্বচ্ছল পরিবারের সন্তানদের মাঝেও মাদকাসক্তি উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এর ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ছে, বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা, আর ধ্বংসের পথে হাঁটছে একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্ম।

সংঘবদ্ধ চক্রের নিয়ন্ত্রণে মাদক সরবরাহ
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাড়াইল উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মিতভাবে মাদক সরবরাহ করছে। সীমিত নজরদারি এবং কিছু অসাধু ব্যক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ছত্রচ্ছায়ায় এই অবৈধ ব্যবসা দিন দিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের টার্গেট করে নানা প্রলোভন ও কৌশলের মাধ্যমে তাদের মাদকাসক্ত করে তোলা হচ্ছে।

বাড়ছে অপরাধ, ভেঙে পড়ছে পরিবার
মাদকের সরাসরি প্রভাব পড়ছে উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক মাদকাসক্ত পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি করছে। শারীরিক নির্যাতন, মানসিক চাপ, এমনকি বাবা-মায়ের ওপর চড়াও হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাম্প্রতিক সময়ে তাড়াইল উপজেলায় চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এসব ঘটনার পেছনে মাদকাসক্তিই বড় কারণ বলে তারা মনে করছেন।

মাদক কেবল একজন মানুষকে নয়, ধ্বংস করে দেয় পুরো পরিবারকে। সন্তানকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে অসহায় হয়ে পড়ছেন অনেক বাবা-মা। পারিবারিক কলহ, আর্থিক সংকট, সামাজিক লজ্জা ও মানসিক বিপর্যয় সব মিলিয়ে পরিবারগুলো চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ঝরে পড়ছে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে, অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে তাদের ভবিষ্যৎ।

এ বিষয়ে তাড়াইল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ জালাল উদ্দীন বলেন, “মাদক নির্মূলে পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে শুধু পুলিশের পক্ষে এই সমস্যা সম্পূর্ণ সমাধান করা সম্ভব নয়। সমাজের সব স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।”

সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদক সমস্যা মোকাবিলায় কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ। তাদের মতে পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

যুব সমাজকে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সমাজপতিদের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ও নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের মতামত- “মাদক একটি জাতিধ্বংসী ব্যাধি। এটি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ সবকিছুকে ধ্বংস করে দেয়। শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দল, আলেম সমাজ ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই ভয়াবহ সংকট থেকে মুক্তি সম্ভব নয়। এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।”

সময় এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার তাড়াইলে মাদকের বিস্তার এখন আর শুধু একটি অপরাধ সমস্যা নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক সংকটে রূপ নিয়েছে। সময়মতো কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্র এই তিনের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে তাড়াইলকে মাদকের ভয়াল গ্রাস থেকে মুক্ত করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ ও সুস্থ পথে ফিরিয়ে আনতে।