সরকারি চাকরির নির্ধারিত ও সীমিত আয়ের কাঠামোর বিপরীতে কীভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের একজন উপসহকারী প্রকৌশলী তা নিয়ে পটুয়াখালীতে ব্যাপক আলোচনা ও প্রশ্ন উঠেছে। এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের মতে, চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জীবনযাত্রায় আসে নাটকীয় পরিবর্তন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান অল্প সময়ের মধ্যেই কলাপাড়া পৌর এলাকায় প্রায় পাঁচ কোটি টাকা মূল্যের একটি বিলাসবহুল চারতলা ভবন নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি নামে বেনামে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ক্রয়ের অভিযোগও উঠেছে।
নাজমুল হাসানের বাড়ি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার মিঠাগঞ্জ ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মিঠাগঞ্জ গ্রামে। তিনি অবিবাহিত। দুই ভাইবোনের পরিবারে তাঁর পিতা মকবুল মৃধা একজন কৃষক হিসেবে পরিচিত।
সম্প্রতি কলাপাড়ার বাসিন্দা গোলাম কিবরিয়া নামে এক ব্যক্তি পটুয়াখালী জেলা রিপোর্টার্স ক্লাবে নাজমুল হাসানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। তবে অভিযোগপত্রে দেওয়া ঠিকানা সরেজমিনে যাচাই করে অভিযোগকারীর অস্তিত্ব ও ঠিকানা সঠিক পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগকারীর পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও অভিযোগে উত্থাপিত সম্পদসংক্রান্ত তথ্যগুলো অনুসন্ধানে নতুন নতুন অসংগতি সামনে আসে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কলাপাড়া পৌরসভার কলেজ রোড এলাকায় (স্থানীয়ভাবে পরিচিত) নামফলক ও হোল্ডিং নম্বরবিহীন একটি নবনির্মিত চারতলা ভবন রয়েছে, যেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা (সিসিটিভি ক্যমেরা) লক্ষ্য করা গেছে। যদিও এলাকাবাসী রাস্তাটিকে ‘কলেজ রোড’ নামে চেনে কিন্তু বিভিন্ন সরকারি নথিতে ঠিকানা হিসেবে ‘মাদ্রাসা রোড’ ব্যবহার করা হয়েছে। ঠিকানার এই দ্বৈততা তথ্য গোপনের কৌশল কি না সে প্রশ্নও উঠেছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, ভবনটির একটি হোল্ডিং নম্বর (২১/১) থাকলেও ‘খানা তালিকা’ রেজিস্টারে এর সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। ভবনের জমিটি ২০২২ সালে আব্দুল সাত্তার কাজী (সত্তার মাস্টার) নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কেনা হয় বলে দলিলপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
সব নথিতে মালিকের নাম নাজমুল হাসান থাকলেও এলাকাবাসীর কাছে তিনি হাসান মাহমুদ বা হাসান মৃধা নামেও পরিচিত। ভবন নির্মাণকাজে তাঁর পিতাকে নিয়মিত তদারকি করতে দেখা যাওয়ায় স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মকবুল মৃধার বাড়ি’ হিসেবেই পরিচিত। তবে কাগজপত্রে মালিকানা নাজমুল হাসানের নামে।
ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয় ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। চারতলা ভবনের তিন তলায় একটি ফ্ল্যাট নিজের ব্যবহারের জন্য রেখে বাকি ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব ফ্ল্যাট থেকে মাসে লক্ষাধিক টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ভবনের জমির দলিল, পৌরসভার হোল্ডিং নথি এবং বিদ্যুৎ সংযোগের কাগজপত্রে পিতার নাম উল্লেখ রয়েছে ‘মাহবুব হোসেন’। অথচ এলাকাবাসীর কাছে তাঁর পিতা পরিচিত ‘মকবুল মৃধা’ নামে। নাম ও পিতৃপরিচয়ের এই ভিন্নতা সম্পদের প্রকৃত উৎস আড়াল করার কৌশল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার এক কর্মচারী জানান, অতীতেও হাসান মাহমুদ নামে প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত একটি ঘটনায় তাঁর নাম আলোচনায় এসেছিল। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসার ভবন নির্মাণের আগে ও পরে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকে। সেখান থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও কেউ কেউ মনে করছেন।
চারতলা ভবনের পাশের বাসিন্দা মো. রুবেল বলেন, ভবনটি প্রায় এক বছর আগে শেষ হয়েছে। মকবুল মৃধা মাঝেমধ্যে আসেন, তবে বেশিরভাগ সময় ফ্ল্যাটগুলো ভাড়াটিয়ারা ব্যবহার করে। হাসান ভাই খুব কমই এখানে আসেন।
এ বিষয়ে নাজমুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে নিজের নামে কোনো বাড়ি থাকার কথা অস্বীকার করেন। পরে তিনি বলেন, আমি ২০১১ সাল থেকে চাকরি করি এবং এখনো ভাড়া বাসায় থাকি। পায়রা বন্দর এলাকায় জমি অধিগ্রহণের সময় আমার মা ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছেন। সেই টাকা ও নিজের জমানো অর্থ দিয়ে বাড়িটি করা হয়েছে। আমার বাবা কৃষক, ধান বিক্রির টাকায় কিছু জমি কেনা হয়েছে। আমি বাবার একমাত্র ছেলে, সব সম্পত্তি শেষ পর্যন্ত আমারই।
এলাকাবাসী ও সচেতন মহলের দাবি, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হলে সরকারি দায়িত্বের আড়ালে গড়ে ওঠা এই বিপুল সম্পদের প্রকৃত উৎস, সম্ভাব্য অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে।