আমতলী (বরগুন) প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬ , আজকের সময় : বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারী, ২০২৬

আমতলী মডেল মসজিদ আট বছরেও অসম্পূর্ণ নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ, তদন্ত দাবি

আমতলী উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নির্মাণকাজ আট বছরেও শেষ হয়নি। দীর্ঘসূত্রতা ও বারবার কাজ বন্ধ থাকার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদার ও গণপূর্ত বিভাগের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে অনিয়ম হচ্ছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, কার্যাদেশে নির্ধারিত মান ও সামগ্রী ব্যবহার না করেই নির্মাণকাজ করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন নির্মাণশ্রমিক জানান, কাজ চালিয়ে নিতে গণপূর্ত বিভাগের সংশ্লিষ্টদের ১০ থেকে ১২ শতাংশ ঘুষ দিতে হয়। এর ফলে ঠিকাদার লাভের আশায় নিম্নমানের কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও তারা দাবি করেন।

জানা গেছে, ২০১৭ সালে ধর্ম মন্ত্রণালয় সারাদেশে মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বরগুনা গণপূর্ত বিভাগ আমতলী উপজেলা মডেল মসজিদ নির্মাণের দরপত্র আহ্বান করে। ১২ কোটি ৯০ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি পায় পটুয়াখালীর ‘আবুল কালাম আজাদ ট্রেডার্স’। কার্যাদেশ অনুযায়ী দুই বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরুই করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।

পরবর্তীতে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে মেয়াদ বাড়িয়ে কাজ শুরু করা হলেও জমি-সংক্রান্ত জটিলতায় নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ চার বছর কাজ বন্ধ থাকার পর সময়মতো কাজ শুরু করতে ব্যর্থ হওয়ায় ওই প্রতিষ্ঠানের চুক্তি বাতিল করে বরগুনা গণপূর্ত বিভাগ পুনরায় দরপত্র আহ্বান করে। ২০২৫ সালের জুন মাসে কাজটি পান পটুয়াখালীর ঠিকাদার ফিরোজ মিয়া। তিনি গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে নির্মাণকাজ শুরু করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শুরুর পর থেকেই নিম্নমানের রড, ইট, সিমেন্ট ও পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। এ নিয়ে এলাকাবাসী বাধা দিলে এক সপ্তাহ কাজ বন্ধ থাকে। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আশরাফুল ইসলাম কাজ তদারকি শুরু করেন। তবে তাদের অগোচরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আবারও নিম্নমানের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানান স্থানীয়রা।

সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নির্মাণস্থলে বিপুল পরিমাণ নিম্নমানের ইট স্তুপ করে রাখা হয়েছে এবং সেগুলো দিয়েই মসজিদের সলিংয়ের কাজ করা হচ্ছে। এছাড়া ঢালাইয়ের জন্যও নিম্নমানের বালু ও পাথর মজুদ করা রয়েছে।

আমতলী পৌরসভার বাসিন্দা মো. রিপন মুন্সি, জালাল খাঁন ও সফিকুল ইসলাম সোহাগ তালুকদার বলেন, দেশের অন্যান্য মডেল মসজিদে মুসুল্লিরা নিয়মিত নামাজ আদায় করছেন, অথচ আমাদের মডেল মসজিদে আট বছর ধরে শুধু ইট-পাথরের কাজই চলছে। এখন যে কাজ হচ্ছে, তাতেও স্পষ্ট অনিয়ম রয়েছে। তারা নিম্নমানের নির্মাণকাজের সঙ্গে জড়িত ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

এ বিষয়ে ঠিকাদার ফিরোজ মিয়া সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দ্রুতগতিতে কাজ চলছে। নিম্নমানের ইট ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে সাক্ষাৎকার দিতে অনীহা প্রকাশ করেন।

বরগুনা গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম মিরাজ জানান, সলিংয়ের কাজে কিছু নিম্নমানের ইট আনা হয়েছিল। সেগুলো সরিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বরগুনা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফয়সাল আলম বলেন, মডেল মসজিদের অনিয়মের বিষয়ে কেউ তাকে অবহিত করেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসকের সমন্বয় সভায় এ বিষয়ে আলোচনা ও কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই।

আমতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ জাফর আরিফ চৌধুরী বলেন, বরগুনা জেলা প্রশাসকের সমন্বয় সভায় মডেল মসজিদের অনিয়মের বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ তদারকির জন্য একটি কমিটি গঠন করা হবে এবং কমিটির প্রতিনিধিরা সরেজমিনে উপস্থিত থেকে নির্মাণকাজ তদারকি করবেন।