নিজস্ব প্রতিবেদক: , আপলোডের সময় : শনিবার, ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬ , আজকের সময় : রবিবার, ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ওরিয়ন গ্রুপের প্রতিষ্ঠানে অর্ধশত কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন ইসলামী ব্যাংকের

প্রথম দফায় ওরিয়ন গ্রুপের পলাতক চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিমের মালিকানাধীন ওরিয়ন নিট টেক্সটাইলকে অর্ধশত কোটি টাকার ঋণ অনুমোদনের তথ্য প্রকাশের পর ব্যাংকিং খাতে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে- প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ থাকা, মালিক পলাতক এবং ঋণসমূহ কুঋণে পরিণত হওয়ার পরও ইসলামী ব্যাংকের একটি প্রভাবশালী মহল পরিকল্পিতভাবে নতুন অর্থ ছাড়ের উদ্যোগ নেয়।

অনুসন্ধানে পাওয়া অভ্যন্তরীণ ব্যাংক নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি শুধুমাত্র ইসলামী ব্যাংকের ফার্মগেট শাখা থেকেই আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ২৫০ কোটি টাকা উত্তোলন করেছে। ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত ঋণ স্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওরিয়ন নিট টেক্সটাইলের এইচপিএসএম (ফান্ডেড ও নন-ফান্ডেড) ঋণ ৮৩ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ঋণ ১০৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা এবং স্পেশাল ঋণ ৪০ কোটি ২ লাখ টাকা- সব মিলিয়ে মোট ঋণ স্থিতি দাঁড়ায় ২৩০ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এছাড়া ফোর্স ইনভেস্টমেন্ট বাবদ ওভারডিউ রয়েছে ৩০ লাখ টাকা। এইচপিএসএম ঋণের লিমিটের মেয়াদ শেষ হয় ৩০ অক্টোবর ২০২৩ এবং স্পেশাল ঋণের মেয়াদ শেষ হয় অক্টোবর ২০২৪ সালে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধিমালা অনুযায়ী এসব ঋণ ইতোমধ্যে মন্দ ও কুঋণে পরিণত হয়েছে।

ওরিয়ন নিট টেক্সটাইলের এইচপিএসএম ও স্পেশাল ঋণের লিমিট মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘ডিফল্টার ও নন-অপারেশনাল ইউনিট’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কথা। তবুও ওই প্রতিষ্ঠানের নামে নতুন করে ঋণ অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে প্রধান কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়। নথিতে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির সর্বশেষ ফ্যাক্টরি ভিজিট রিপোর্টে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ থাকার বিষয়টি উল্লেখ থাকলেও তা গোপন রেখে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। প্রশ্ন উঠেছে- এই ভিজিট রিপোর্ট ও ঝুঁকি মূল্যায়ন কারা পরিবর্তন বা উপেক্ষা করেছে?

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বিগত বছরগুলোতে ওরিয়ন নিট টেক্সটাইলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার নম্বর ১০ ও ১৩ লঙ্ঘন করে বিপুল পরিমাণ ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি একসেপ্টেন্স দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে পণ্য যাচাই, রপ্তানি আদেশ ও বাস্তব উৎপাদন সক্ষমতা মূল্যায়ন ছাড়াই এসব এলসি অনুমোদন করা হয়। ফলে রপ্তানি না থাকায় পরবর্তীতে ব্যাংককে ফোর্স লোন সৃষ্টি করে বিল পরিশোধ করতে হয়- যার দায় শেষ পর্যন্ত এসে পড়ে ব্যাংকের ওপর।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিমের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা চলমান থাকায় তার বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তা সত্ত্বেও তিনি দেশ ছাড়েন। অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশ ছাড়ার পরও ব্যাংকের সঙ্গে তার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। অনলাইন ও তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তিনি সংশ্লিষ্ট ঋণ নিষ্পত্তি ও নতুন অর্থ ছাড়ের বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী, পলাতক ও অভিযুক্ত কোনো ঋণগ্রহীতার সঙ্গে এ ধরনের লেনদেন গুরুতর অপরাধের শামিল।

সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হলো, নতুন ঋণের অর্থ ছাড়ের সময় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একসেপ্টেন্সপ্রাপ্ত সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে প্রায় ১.৫ শতাংশ কমিশন কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এই কমিশন মূলত ওরিয়ন নিট টেক্সটাইলের বহন করার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির অ্যাকাউন্টে কোনো অর্থ না থাকায় তা সাপ্লায়ারদের কাছ থেকেই আদায় করা হচ্ছে। সাপ্লায়ারদের অভিযোগ, কমিশনে রাজি না হলে তাদের বিল আটকে রাখার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এতে তারা কার্যত জিম্মি অবস্থায় পড়ে ডিসকাউন্টে পেমেন্ট গ্রহণে বাধ্য হচ্ছেন।

এ বিষয়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ফার্মগেট শাখার ব্যবস্থাপক ফারুক আল মামুন বলেন, “কিছু পেমেন্ট করা হয়েছে ঠিক, তবে সবকিছু ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী করা হচ্ছে।” তবে বন্ধ প্রতিষ্ঠানে ঋণ অনুমোদন, পলাতক মালিকের ভূমিকা এবং সাপ্লায়ারদের কাছ থেকে কমিশন কেটে নেওয়ার বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

ওরিয়ন গ্রুপের ভাইস প্রেসিডেন্ট আশরাফুল আলমের কাছে বন্ধ প্রতিষ্ঠানের অনুকুলে নতুন ঋন মঞ্জুরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কিছুই জানেননা বলে জানান। তিনি বলেন, নতুন ঋন মঞ্জুর হয়ে থাকলে তা ইসলামী ব্যাংক ফার্মগেট শাখার ম্যানেজারই বলতে পারবেন কিভাবে ঋন মঞ্জুর হয়েছে। এছাড়া ঋন মঞ্জুর করতে চার্জ ফরমসহ অন্যান্য কাগজপত্র ওবায়দুল করিম কিভাবে স্বাক্ষর করেছে জানতে চাইলে তিনি জানান, ওবায়দুল করিম বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন। ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম পলাতক থাকায় তার মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়; বরং একটি সংঘবদ্ধ ব্যাংকিং সিন্ডিকেটের ইঙ্গিত দেয়। বন্ধ প্রতিষ্ঠান, পলাতক মালিক ও কুঋণ থাকা সত্ত্বেও নতুন ঋণ অনুমোদন হলে তা স্পষ্টতই মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ব্যাংক কোম্পানি আইন ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার পরিপন্থী। ইতোমধ্যে এ ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক ও আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট এর স্বতন্ত্র তদন্ত দাবি করেছেন সুশীল সমাজ ও ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টরা।