মনজুর মোরশেদ তুহিন (বিশেষ প্রতিনিধি): , আপলোডের সময় : সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ , আজকের সময় : বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

চাঁদা বন্ধ, বেড়েছে দখলদারিত্ব : মিরপুর সড়কে বেপরোয়া হকারে জনভোগান্তি চরমে

রাজধানীতে সড়ক দখল করে ব্যবসা করা হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় বন্ধ হয়েছে এটি ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবেই দেখছেন অনেকে। তবে বাস্তবে চাঁদা না দিলেও হকারদের বেপরোয়া দখলদারিত্বে নগরজীবন হয়ে উঠেছে আরও দুর্বিষহ। প্রশাসনের শিথিল নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণহীনতার সুযোগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক ও ফুটপাত কার্যত দখলমুক্ত নেই।

সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুর মাজার রোড (শাহ আলী মাজার এলাকা) থেকে মিরপুর–১০ গোলচত্বর পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার সড়কে একই চিত্র। ৬ লেনবিশিষ্ট (৩+৩) মিরপুর রোডের প্রতি লেনের প্রস্থ ১০ ফুট, মোট প্রস্থ প্রায় ৮০ ফুট। মাঝখানে ৩ ফুট ডিভাইডার এবং দুই পাশে ৬ ফুট করে ফুটপাত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ফুটপাত তো বটেই, মূল সড়কের চারটি লেন পর্যন্ত হকারদের দখলে।

বেলা দুইটার পর থেকে শহরের অভ্যন্তরীণ রুটের বাসগুলোকে এই তিন কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে সময় লাগছে প্রায় ২০ মিনিট। যানজটের প্রধান কারণ হচ্ছে ফুটপাতের পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের লেন বন্ধ করে হকারদের বেচাকেনা। কাঁচাবাজার, ফল, মাছ, সবজি, মুদি পণ্য, জুতা, গার্মেন্টস সামগ্রী সহ প্রায় সব ধরনের পণ্যই বিক্রি হচ্ছে সড়কের ওপর।

এছাড়া পায়ে চালিত ও ব্যাটারিচালিত হাজারো অটোরিকশা যাত্রী পাওয়ার আশায় সড়কের মাঝেই দাঁড়িয়ে থাকে। খালি বাস ও ট্রাক ট্রিপ না থাকলে রাস্তার ওপরই পার্কিং করে রাখা হয়। ফলে যান চলাচলের জন্য কার্যত মাত্র দুই লেন খোলা থাকে, যা পুরো এলাকার যানজটকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে।

প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো কঠোর নজরদারি নেই। প্রকাশ্যে ফুটপাত ও সড়ক দখল করে ব্যবসা চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। অবৈধ সুবিধা নেওয়ার আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ীই মুখ খুলতে চান না যে কারা এই দখলদারিত্বের পেছনে রয়েছে কিংবা কোন প্রভাব বলয়ে তারা এমন সুযোগ পাচ্ছে, সে প্রশ্নও রয়ে গেছে অমীমাংসিত।

মিরপুরের চিত্র কেবল উদাহরণ। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের আওতায় গুলিস্তান, চকবাজার, মগবাজারসহ আরও বহু এলাকায় একই অবস্থা। সড়ক দখল করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি এখন যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন থেকে রাজনৈতিক কর্মী যেন কারও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমান নয়।

মিরপুর-১ এলাকায় রাস্তা দখল করে ব্যবসা করা রায়হান বলেন, চার বছর ধরে এখানে ব্যবসা করি। আগে অন্য হকারের সঙ্গে দিনমজুর হিসেবে কাজ করতাম। সরকার পতনের পর সুযোগ বুঝে নিজেই জায়গা নিয়ে নিয়েছি। ব্যবসা ভালো হচ্ছে, কারণ এখন কাউকে চাঁদা দিতে হয় না।

আরেক হকার শামসুল আলম বলেন, আগে দুই পাশের দুই লাইন বন্ধ করে ব্যবসা করতাম, চাঁদা দিতাম। এখন নতুন যারা আসছে, তাদের চাঁদাও দিতে হয় না। এই সুযোগে তারা আরও এক লেন দখল করে দোকান দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাঁদাবাজি বন্ধ হওয়া ইতিবাচক হলেও নিয়ন্ত্রণহীন দখলদারিত্ব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ফুটপাত পথচারীর জন্য এবং সড়ক যান চলাচলের জন্য, এই মৌলিক নীতির বাস্তবায়ন না হলে রাজধানীর যানজট ও জনভোগান্তি আরও বাড়বে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, হকারদের পুনর্বাসন ও বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া শুধু উচ্ছেদ অভিযানে স্থায়ী সমাধান মিলবে না। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নীরবতা ও নজরদারির অভাব জনমনে প্রশ্ন তুলছে—রাজধানীর সড়ক ও ফুটপাতের দায়িত্ব আসলে কার?

চাঁদা বন্ধ হলেও সড়কে বেপরোয়া হকারদের দখলদারিত্বে রাজধানীবাসী আজ চরম ভোগান্তিতে। কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সমস্যা সমাধানের কোনো আলামত আপাতত দেখা যাচ্ছে না।