স. অধ্যাপক ডাঃ সামিনা আরিফ: , আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬ , আজকের সময় : সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬

সচেতন খাদ্যাভাসই রমজানে দেহ মনের সুস্থতার চাবিকাঠি: স. অধ্যাপক ডাঃ সামিনা আরিফ

রমজানে আমাদের সুষম, পরিমিত ও সহজপাচ্য খাবার গ্রহণ করা উচিত। সেহরিতে এমন খাবার গ্রহণ করা উচিত যা দীর্ঘ সময় শক্তি জোগাবে যেমন: লাল চালের ভাত, আটার রুটি বা ওটসের মতো জটিল শর্করা। ধীরে ধীরে হজম হবার ফলে রক্তে শর্করা হঠাৎ করে কমে যাবার ঝুঁকি কম থাকে। এর পাশাপাশি প্রোটিন জাতীয় খাবার যেমন ডিম, ডাল, মাছ বা মুরগি খাবার প্রয়োজন। কারণ প্রোটিন দেহের গঠন শক্তি, রোগ প্রতিরোধ ও হরমোনীয় ভারসাম্য রক্ষা করে। শাকসবজি ও আশযুক্ত খাবার কোষ্ঠকাঠিন্য প্রতিরোধে সাহায্য করে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে পানিশূণ্যতা থেকে মাথাব্যাথা বা অবসাদ না হতে পারে। রোজায় দীর্ঘ সময় পানি পান না করার ফলে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরী হয়। যা ইউরিন ইনফেকশন বা ইউটিআই হওয়ার প্রধান কারণ। তাই প্রতিদিন ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত সময়ে পর্যাপ্ত (কমপক্ষে ২-৩ লিটার) পানি পান করতে হবে। ইউরিন ইনফেকশন দেখা দিলে দেরি না করে রেজিস্ট্রার্ড চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

সেহরিতে পরিমিত কার্বহাইড্রেট, প্রোটিন এবং পর্যাপ্ত শাকসবজি রাখা প্রয়োজন, অতিরিক্ত লবণ (আচার, লবনাক্ত ভর্তা) না খাওয়াই ভালো। সেহরিতে তেহারি, খিচুড়ি, বিরিয়ানি ইত্যাদি না খাওয়াই ভালো। অতিরিক্ত মসলাযুক্ত ও তৈলাক্ত খাবার খাওয়া যাবে না। যা রোজাদারকে তৃষ্ণার্ত করে। রোজার মাসে অতিরিক্ত চা ও কফি পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে কারণ ক্যাফেইন পানি শূন্যতা বাড়ায়। অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার খাওয়া, পানি কম খাওয়া ও খাবার মেনুতে আশযুক্ত খাবার না রাখলে কোষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে। মনে রাখতে হবে দীর্ঘদিন কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে পাইলসের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেহরির সময় ঠিক ঘুমানোর আগ দিয়ে ফল না খাওয়াই ভালো কারণ তাতে অস্বস্তি, অ্যাসিডিটি, পেট ফুলে যাওয়া, ইনসোমনিয়া, রিফ্লাক্স দেখা দিতে পারে।  রমজানে অতিরিক্ত রিফাইন্ড চিনি বা সুগার গ্রহণ করা ঠিক না। কারণ চিনি শরীরের গ্লুকোজ হোমিওস্ট্যাসিস বিঘিœত করতে পারে। খাবারের পর রক্তে শর্করা দ্রুত বৃদ্ধি এবং তারপর হঠাৎ  হ্রাস দেখা দিতে পারে। যা ক্লান্তি বা দুর্বলতার অনুভূতি সৃষ্টি করে। রমজানে সুষম পুষ্টি ও পর্যাপ্ত তরল  খাবার গ্রহণই শরীরকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করে।

ইফতার এর ক্ষেত্রে পরিমিত  মসলা ও চর্বিযুক্ত এবং সহজপাচ্য খাবার হওয়া উচিত। কারণ সারাদিন রোজার পর পাকস্থলী হঠাৎ করে ভারী খাবার সহ্য করতে পারবে না। প্রথমে হালকা ইফতার যেমন খেজুর, মৌসুমি ফল খাওয়া ভালো যা ভিটামিন, মিনারেল ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে। সাথে প্রোটিন ও ফাইবারযুক্ত খাবার রাখা যেতে পারে। ভাজাপোড়া, অতিরিক্ত তেল, মসলাযুক্ত ও অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার না খাওয়াই ভালো। কারণ তা থেকে গ্যাষ্টিক, অ্যাসিডিটি ও অস্বস্তি বাড়তে পারে। ইফতার এর পর পরই চা, কফি পান না করাই ভালো। রমজানে শরীরের হাইড্রেশন ও হরমোনাল ব্যালেন্স পরিবর্তিত হয়। রমজানে দীর্ঘ সময় রোজা রাখার ফলে শরীরে ডিহাইড্রেশন, ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালান্স ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। ইফতারে পানি সমৃদ্ধ ফল যেমন তরমুজ, শসা, কমলা, পেপে, আনারস ও ডাবের পানি গ্রহণ শরীরকে দ্রুত হাইড্রেট করে, শক্তি পুনরুদ্ধার করে এবং হজম ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক রাখে। প্রাকৃতিকভাবে পানি, ভিটামিন, মিনারেল ও ডাইজেস্টিভ এনজাইম সরবরাহ করে। যা রমজানে শরীর ও মনের কার্যক্ষমতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। শরীর হাইড্রেটেড রাখা এবং পুষ্টিকর খাবারের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় শক্তি ধরে রাখা প্রয়োজন। অতিরিক্ত তেল, মসলা, চিনি, ক্যাফেইন এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। শাকসবজি ও ফলমূল বেশি করে খেতে হবে। যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে সাহায্য করবে।

শিশুদের ক্ষেত্রে রোজায় পুষ্টি ও পানিশূন্যতা রোধে বিশেষ মনোযোগ দেয়া জরুরি। পানিশূন্যতা রোধে ইফতার ও সেহরির মাঝে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। তৈলাক্ত ও অতিরিক্ত মসলাদার খাবার দেয়া যাবে না। বাহিরের তৈরী ভাজা খাবার না দেয়াই ভালো।

আমাদের জানা প্রয়োজন তেল দুই বা ততোধিক বার রান্নায় ব্যবহার করলে তার রাসায়নিক গঠন পরিবর্তন হয়ে বিষাক্ত টক্সিন, মুক্ত মৌল ও ট্রান্স ফ্যাট তৈরী হয়। এর ফলে অ্যাসিডিটি, বুক জ¦ালাপোড়া, কোলেস্টেরল বৃদ্ধি, উচ্চ রক্তচাপ, প্রদাহ, এমনকি দীর্ঘমেয়াদ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত জিলাপি, লাড্ডু, চানাচুর, সস, মিষ্টি, কোল্ড ড্রিংকস এবং বোতল পানীয়, রাস্তার পাশে খোলা খাবারে মাত্রাতিরিক্ত ও অস্বাস্থ্যকর রং ব্যবহার করা হয়। রং মেশানো খাবারের প্রধান ক্ষতিকর প্রভাব হলো দীর্ঘদীন ব্যবহারে এসিডিটি হতে দেখা যায়। মনে রাখতে হবে পেটের অ্যাসিড বেশি উৎপাদিত হলে, অ্যাসিড উপরের খাদ্যনালীতে ফিরে আসলে, হজম বিলম্ব বা জীবনধারার অনিয়মের কারণে এসিডিটি হতে পারে।

বাজারজাত অধিকাংশ ইফতারে কৃত্রিম রং ব্যবহার করতে দেখা যায়। কৃত্রিম রং থেকে ক্যান্সারের ঝুঁকি, শিশুদের আচরণগত সমস্যা অর্থাৎ অতিরিক্ত চঞ্চলতা, মনোযোগের ঘাটতি বা অউঐউ র সমস্যা বাড়াতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু কৃত্রিম রং থেকে চুলকানি, র‌্যাশ, শ^াসকষ্ট বা অ্যাজমা বেড়ে যেতে পারে। এছাড়াও অতিরিক্ত কৃত্রিম রং মেশানো খাবার খেলে তীব্র এসিডিটি, কোষ্ঠকাঠিন্য, বমি বমি ভাব এবং ওইঝ এর সমস্যা হতে পারে। এছাড়াও সাধারণ কৃত্রিম রং বা টেক্সটাইল ডাই খাবারে মেশালে কিডনি ও লিভার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী কৃত্রিম রং মেশানো পানীয় বা খাবার শরীরের হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে এবং উচ্চ রক্তচাপের কারণ হতে পারে। বাজারের খোলা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরা, টাইফয়েড এবং ফুড পয়জনিংয়ের মতো মারাত্মক রোগ হতে পারে। নোংরা পরিবেশ, খোলা বাতাস এবং দূষিত পানির কারণে এসব খাবরে জীবাণু ছড়ায়, যা পেটের পীড়া, বমি, বমি বমি ভাব এবং তীব্র পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব খাবার খেলে লিভার, ফুসফুস ও কিডনির জটিল রোগের কারণ হতে পারে। তাই ঘরে তৈরী হাইজিন যুক্ত ইফতার, সেহরি সহ পানীয় পান করা উচিত। অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার না খাওয়াই ভালো, ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় ( চা, কফি, কোমল পানীয়) অতিরিক্ত লবণাক্ত না খাওয়ই ভালো।

বাজারজাত কোমল পানীয় বা সফট ড্রিঙ্কস এ মূলত সোডিয়াম বেনজয়েট, পটাশিয়াম সরবেট, ফসফরিক অ্যাসিড, সাইট্রিক অ্যাসিড, কার্বন ডাই অক্সাইড ব্যবহার করা হয়। কোমল পানীয়তে ব্যবহৃত প্রিজারভেটিভ অতিরিক্ত ও নিয়মিত গ্রহণ করলে শরীরে অ্যালার্জি, চর্মসমস্যা, শ্বাসকষ্ট, হজমের সমস্যা, স্নায়বিক প্রভাব ইত্যাদি ক্ষতি হতে পারে। তাই রমজান মাসে আমাদের এইগুলো পরিহার করা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। সুস্থ থাকতে হলে ইফতারের পর কিছুক্ষণ হালকা হাটাচলা করা ভালো। রমজানে দীর্ঘ সময় রোজা রাখার কারণে শরীরের শক্তির চাহিদা, পানির ভারসাম্য এবং পরিপাকতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রমের দিকে বিশেষ নজর দেয়া প্রয়োজন।

বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে – পরিবারের কোন সদস্যের যদি কিডনি, হার্টের সমস্যা, গর্ভবতী মায়েদের বা ডায়াবেটিস আছে তাদের অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ঔষধ বা ইনসুলিনের ডোজ ও সময় নির্ধারন করে নিতে হবে। অন্যথায় শারিরীক কোন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। সকলের সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।

 

ডাঃ সামিনা আরিফ

সহযোগী অধ্যাপক

অধ্যক্ষ-কাম-অধীক্ষক (ভারপ্রাপ্ত)

বি.ফার্ম (অনার্স), এম.ফার্ম, এমবিএ (এইচআরএম), ডি.এইচ.এম.এস

ফেডারেল হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ফার্মগেট, ঢাকা

মোবাইল: ০১৭৫২৫৭২২১৩