সাখাওয়াত হোসেন , কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক: , আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬ , আজকের সময় : মঙ্গলবার, ১৭ মার্চ, ২০২৬

জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ: স্থানীয় গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক বার্তা

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড বলা হয়। কারণ তৃণমূল পর্যায়ে জনগণের প্রত্যাশা, সমস্যা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হলো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এসব প্রতিষ্ঠান জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়াই স্বাভাবিক এবং কাম্য। কিন্তু সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেশের ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জনমনে গভীর প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি হচ্ছে জনগণের করের অর্থ। কৃষক থেকে শুরু করে শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রবাসী এবং চাকরিজীবী-দেশের প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কর প্রদান করে রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সচল রাখেন। অর্থাৎ এই রাষ্ট্রের প্রশাসন, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের অর্থেই পরিচালিত হয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার ক্ষেত্রে জনগণের মতামত এবং অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন নির্বাচনের পরিবর্তে প্রশাসনিক আদেশে দলীয়ভাবে কিছু ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন তা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই প্রতীয়মান হয়।

জেলা পরিষদ দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। জেলার সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও সংস্কৃতিমূলক কর্মকাণ্ডে সহায়তা প্রদান এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এই প্রতিষ্ঠানটি যদি জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পরিবর্তে রাজনৈতিকভাবে মনোনীত প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই জনগণের প্রত্যাশা ও অংশগ্রহণের জায়গাটি দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সরকার চাইলে খুব সহজেই জেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজন করতে পারত। নির্বাচনই হলো জনগণের মতামত যাচাই করার সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতি। কিন্তু নির্বাচন আয়োজনের পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত অনেকের কাছেই স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে প্রশাসনিক ও দলীয় নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনার প্রচেষ্টা হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই প্রবণতা যদি দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকে, তাহলে তা দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য একটি অস্বাস্থ্যকর দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ ধরনের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো যখন দলীয় প্রভাবের আওতায় পরিচালিত হয়, তখন সেখানে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এতে করে উন্নয়ন কার্যক্রমও অনেক সময় জনগণের প্রকৃত চাহিদার পরিবর্তে রাজনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-এই রাষ্ট্র কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি দেশের প্রতিটি নাগরিকের। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় যখন রাষ্ট্র পরিচালিত হয়, তখন রাষ্ট্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণের প্রতিফলন থাকা জরুরি। অন্যথায় জনগণের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মোটেই শুভ লক্ষণ নয়।

বর্তমান সময়ে দেশের মানুষ একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন প্রত্যাশা করে। তাই জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের মতো সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত করার উদ্যোগ নেওয়াই হবে সময়োপযোগী এবং গণতন্ত্রসম্মত পদক্ষেপ। এতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে এবং গণতান্ত্রিক চর্চাও আরও শক্তিশালী হবে।

গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণ। তাই জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রে জনগণের মতামত, অংশগ্রহণ এবং ভোটাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক দায়িত্ব হওয়া উচিত।

সাখাওয়াত হোসেন , কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক