মনজুর মোর্শেদ তুহিন (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ, ২০২৬ , আজকের সময় : শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬

প্রতারক চক্রের ফাঁদে সংখ্যালঘুর জমি, এএসআইয়ের দাপটে দখলের অভিযোগ

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে প্রতারণার সুপরিকল্পিত চক্রের ফাঁদে পড়ে সংখ্যালঘু একটি পরিবারের জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতারক বিক্রেতা ও প্রভাবশালী ক্রেতার যোগসাজশে তাদের বৈধ সম্পত্তি দখলের চেষ্টা চলছে। পুলিশের এক এএসআইয়ের ক্ষমতার দাপটে সেই দখল প্রক্রিয়া এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। ফলে চরম শঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে পরিবারটি।

ঘটনাটি উপজেলার ২নং মির্জাগঞ্জ ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের কপালভেড়া গ্রামে। ভুক্তভোগী স্বপন চন্দ্র শীল গংদের অভিযোগ, তাদের মালিকানাধীন জে.এল নং-৩৮, এস.এ খতিয়ান নং-৬৪, দাগ নং-৩৪৫-এর ১.৩৫ একর জমির একটি অংশ টার্গেট করে প্রতারণার জাল পেতে বসে একটি চক্র।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে থাকা এই জমির ৮ শতাংশ অংশ শ্যাম সুন্দর শীল নামে এক ব্যক্তি কোনো বৈধ স্বত্ব বা দখল না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর রেকর্ড তৈরি করে পুলিশের এএসআই মোঃ সিদ্দিকুর রহমানের কাছে বিক্রি করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই “কাগজ”কে হাতিয়ার বানিয়ে পরিকল্পিতভাবে জমি দখলের প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিরোধপূর্ণ জমিতে মাটি কেটে ভিটা তৈরি করে পুরাতন টিনের ঘর স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে “ক্রেতা মোঃ সিদ্দিকুর রহমান” লেখা একটি সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। একইসঙ্গে জোরপূর্বক পাকা বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের কাজও দ্রুতগতিতে চলছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকৃত মালিকদের আপত্তি উপেক্ষা করে প্রভাব খাটিয়ে দ্রুত স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে, যাতে পরবর্তীতে বিরোধ জটিল আকার ধারণ করে এবং দখল স্থায়ী করা যায়।

ভুক্তভোগী স্বপন চন্দ্র শীল বলেন, ওয়ারিশ সূত্রে আমরা আমাদের নানার কাছ থেকে জমি পেয়েছি। আমার মা এখনো জীবিত। আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখলে আছি। হঠাৎ ভুয়া কাগজ দেখিয়ে শ্যাম সুন্দর আমাদের জমি পুলিশের এএসআই সিদ্দিকুর রহমানের কাছে বিক্রি করেছে। এখন পুলিশের ক্ষমতা দেখিয়ে জোর করে দখল নিচ্ছে। অথচ এই দাগে শ্যামের মূল জমি ছিল ৩১ শতাংশ, কিন্তু বিভিন্নভাবে রেকর্ড দেখিয়ে সে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি করেছে। সর্বশেষ ভুয়া রেকর্ড দেখিয়ে ৮ শতাংশ জমি বিক্রি করে দিয়েছে।

এ ঘটনায় স্বপন চন্দ্র শীল পুলিশ সুপার ও মির্জাগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। পাশাপাশি তিনি পটুয়াখালী সিনিয়র যুগ্ম জেলা জজ ১ম আদালতে মোঃ সিদ্দিকুর রহমান (৫০), শ্যাম সুন্দর শীল (৬০) ও মোঃ বারেক (৬০) এর বিরুদ্ধে দেওয়ানি মামলা দায়ের করেন (মামলা নং-২২/২০২৬)।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, থানায় ডাকা হলে এএসআই সিদ্দিকুর রহমান কোনো বৈধ স্বত্ব দলিল দেখাতে পারেননি। এরপরও তার প্রভাবের কারণে নির্মাণকাজ বন্ধ না করে ঈদের ছুটির মধ্যেও দ্রুত চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে অভিযুক্ত শ্যাম সুন্দর শীল দাবি করেন, ৩৪৫ নম্বর দাগে মোট জমির পরিমাণ ৩.৫৫ শতাংশ। ভক্ত শীলের কাছ থেকে আমার ২০ শতাংশ জমি ক্রয় করা আছে। আমি সিদ্দিকুর রহমানের কাছে মাত্র ৮ শতাংশ বিক্রি করেছি। ওই দাগে আমার আরও জমি রয়েছে।

এদিকে মামলা করার পর থেকেই ভুক্তভোগী পরিবারটির ওপর চাপ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠেছে। স্বপন চন্দ্র শীলের ভাই তপন চন্দ্র শীলকে মারধরের উদ্দেশ্যে তাড়া করা হলে তিনি পাশের একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে রক্ষা পান। এ ঘটনায় তিনি মির্জাগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন (জিডি নং-৪০৫, তারিখ-০৯ মার্চ ২০২৬)।

স্থানীয় বাসিন্দা মোঃ মজিবর রহমান বলেন, আমরা জানতাম এটা স্বপন শীলদের জমি। হঠাৎ এক রাতে ভেকু দিয়ে মাটি কেটে ঘর তুলে ফেলা হয়েছে। কোনো মাপঝোক বা আলোচনা কিছুই হয়নি। এভাবে জোর করে দখল নেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগের বিষয়ে এএসআই মোঃ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমি শ্যামের কাছ থেকে জমি ক্রয় করেছি। তার নামে রেকর্ড রয়েছে দেখে জমি কিনেছি। আদালত থেকে আমার বিরুদ্ধে কোনো স্থিতাবস্থার আদেশ দেওয়া হয়নি।

মির্জাগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ শামীম হাওলাদার বলেন, এই জমি সংক্রান্ত অভিযোগ থানায় রয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

তবে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, ভুয়া রেকর্ডের আড়ালে প্রতারণা এবং প্রভাব খাটিয়ে সংখ্যালঘুদের জমি দখলের এ অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর সম্পত্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।