সাখাওয়াত হোসেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট , আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬ , আজকের সময় : মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬

ব্যক্তিগত অপরাধে কেন দলীয় ট্যাগ?

‘রাজনৈতিক ব্যক্তির ব্যক্তিগত অপরাধ’ এবং ‘দলীয় পরিচয়’-এই দুইটি বিষয়কে আমরা প্রায়ই গুলিয়ে ফেলি। এর ফলাফল শুধু বিভ্রান্তিকরই নয়; বরং এটি গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা, ন্যায্যতা এবং পেশাগত মানদণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিশেষ করে, যখন কোনো ব্যক্তি একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন এবং হঠাৎ তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি বা সহিংসতার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ শিরোনামেই দলীয় পরিচয় জুড়ে দেওয়া হয়। এতে একটি স্পষ্ট বার্তা যায়-অপরাধটি যেন ব্যক্তি নয়, পুরো দলের। এখানেই তৈরি হয় মূল সমস্যা।

প্রথমত, একটি মৌলিক নীতি বুঝতে হবে: অপরাধ সর্বদা ব্যক্তিকেন্দ্রিক, যতক্ষণ না প্রমাণিত হয় যে এটি কোনো সংগঠিত নির্দেশনার অংশ। কোনো রাজনৈতিক দল তার গঠনতন্ত্রে কখনোই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে অনুমোদন দেয় না। ফলে, একজন ব্যক্তি তার রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের জন্য অপরাধে জড়ায়, তবে সেটি তার নিজস্ব দায়। এই দায় দলীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া শুধু যুক্তিহীন নয়; বরং এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, গণমাধ্যমের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদের শিরোনাম মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। যদি শিরোনামেই কোনো দলের নাম জুড়ে দেওয়া হয়, তাহলে পাঠকের মনে প্রথমেই একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়-যা পরবর্তীতে পুরো সংগঠনের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ, একই ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ উপস্থাপন সম্ভব ছিল ব্যক্তির নাম, পরিচয় এবং অপরাধের বিবরণ দিয়ে, দলকে সরাসরি জড়ানো ছাড়াই।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বিষয় স্পষ্ট-অনেক সময় ব্যক্তি তার দলীয় পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে সে অপরাধ করে এবং পরে সেটিকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হয়। এই প্রবণতা বন্ধ করতে হলে ব্যক্তির দায়কে ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। অন্যথায়, প্রকৃত অপরাধী আড়ালে থেকে যায়, আর পুরো দল অযথা সমালোচনার মুখে পড়ে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে-কখন দলীয় ট্যাগ ব্যবহার করা যৌক্তিক? উত্তরটি নীতিগতভাবে পরিষ্কার। যখন কোনো কর্মকাণ্ড সরাসরি দলীয় সিদ্ধান্ত বা কর্মসূচির অংশ হয়, তখন সেই ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় উল্লেখ করা অবশ্যই সঙ্গত। যেমন-হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, কিংবা রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত কোনো ঘটনা। এসব ক্ষেত্রে দল সংগঠিতভাবে নির্দেশনা দেয়, এবং সেই অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ফলে, ভালো বা মন্দ-উভয় ফলাফলের দায় দল বহন করবে।

অন্যদিকে, ব্যক্তিগত জীবনের আচরণ-যেমন মাদকাসক্তি, যৌন অপরাধ, পারিবারিক সহিংসতা বা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জেরে সংঘটিত হামলা-এসব কোনোভাবেই দলীয় নীতিমালার প্রতিফলন নয়। একজন ব্যক্তি যদি ব্যক্তিগতভাবে অনৈতিক বা অপরাধমূলক কাজে জড়ান, তবে তার পরিচয় হবে একজন অপরাধী হিসেবে, কোনো দলের প্রতিনিধি হিসেবে নয়।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-আইনের শাসন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রত্যেক নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান। সেখানে বিচার হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। কিন্তু যখন সংবাদে বারবার দলীয় ট্যাগ ব্যবহার করা হয়, তখন একটি অদৃশ্য সামাজিক বিচার শুরু হয়, যা অনেক সময় আইনি প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি গণতন্ত্রের জন্যও ক্ষতিকর।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি তার দায়িত্বশীলতাও অপরিহার্য। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা মানে শুধু তথ্য প্রকাশ নয়; বরং সেই তথ্যের উপস্থাপনায় ন্যায্যতা, ভারসাম্য এবং প্রেক্ষাপট নিশ্চিত করা। একটি ব্যক্তির অপরাধকে দলীয় পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা হলে, তা একদিকে যেমন অন্যায় দোষারোপ তৈরি করে, অন্যদিকে তেমনি সমাজে রাজনৈতিক বিভাজনও বাড়িয়ে দেয়।

সবশেষে বলা যায়, রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সুস্থতা বজায় রাখতে হলে আমাদের একটি নীতিগত অবস্থানে দাঁড়াতে হবে: “অপরাধ ব্যক্তির, দায়ও ব্যক্তির।” দলকে দায়ী করতে হলে স্পষ্ট প্রমাণ থাকতে হবে যে সেই কর্মকাণ্ড দলীয় নির্দেশনায় সংঘটিত হয়েছে। অন্যথায়, ব্যক্তি অপরাধকে দলীয় রঙ দিয়ে উপস্থাপন করা শুধু সাংবাদিকতার নীতিবিরুদ্ধই নয়; বরং এটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধেরও পরিপন্থী।

সাখাওয়াত হোসেন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট