চৈত্রের বিদায় বেলায় নতুন বছরের আগমনি বার্তা বইছে চারদিকে। পুরোনো বছরের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে নতুন প্রত্যাশা নিয়ে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বরণে প্রস্তুত গোটা দেশ। সে প্রস্তুতিতে পিছিয়ে নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা। চৈত্রের খরতাপকে ছাপিয়ে চারুকলা প্রাঙ্গণে এখন শুধুই রঙের উৎসব। রঙতুলির আঁকিবুঁকিতে তৈরি হচ্ছে মুখোশ, পাখিসহ নানা শৈল্পিক কারুকার্য।
দিন-রাত এক করে শিক্ষার্থীরা তৈরি করছেন বিশালাকৃতির মুখোশ, লোকজ মোটিফ আর বর্ণিল সব কাঠামো। চারুকলার আঙিনায় এখন শুধুই রঙের খেলা আর বাঁশ-কাগজের খসখস শব্দ। কেউ কাঠামোতে শেষ পোচ দিচ্ছেন, কেউবা গভীর মমতায় ফুটিয়ে তুলছেন চিরচেনা কোনো পাখির অবয়ব।
ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা যায়, নববর্ষ উদযাপনকে ঘিরে সবচেয়ে প্রাণচঞ্চল পরিবেশ চারুকলা অনুষদে। ভবনের তৃতীয় তলায় শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা যেন উৎসবের আগাম জানান দিচ্ছে রঙ, তুলি আর সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে তৈরি হচ্ছে নানান শিল্পকর্ম। শিক্ষার্থীরা কেউ ক্যানভাসে তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলছেন গ্রামীণ জীবনের চিত্র, কেউবা রঙিন মুখোশ নির্মাণে ব্যস্ত।
বাঘ, সিংহ, পেঁচা, কবুতর, ফুল ও পাখির নান্দনিক নকশায় তৈরি এসব মুখোশ বৈশাখী শোভাযাত্রাকে আরও বর্ণিল করে তুলবে। শুধু মুখোশেই সীমাবদ্ধ নয় প্রস্তুতি। শোভাযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে ‘গাহি সাম্যের গান’ মঞ্চে নির্মাণ করা হচ্ছে বিশালাকৃতির একটি পাখির প্রতিকৃতি, যা ইতোমধ্যে কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
পহেলা বৈশাখ উদযাপন কমিটির আহবাক অধ্যাপক ড. আহমেদ শাকিল হাসমী জানান, উৎসবমুখর পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সার্বিক প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হবে বৈশাখি শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রা শেষে ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ এর প্রদর্শন ও পুরস্কার বিতরণ এবং উন্মুক্ত আপ্যায়ন। এরপর থাকছে লাঠি খেলা ও বিলুপ্ত প্রায় ধুয়া গান। দুপুরে রয়েছে কবিতা আবৃত্তি, বৈশাখের গান, বাউল গান, নৃত্য, রম্য বিতর্ক এবং গম্ভীরা।
এছাড়াও চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষে সোমবার বিকেল ৪টায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বিকাল ৫টায় হবে মেলা উদ্বোধন ও ঘুড়ি উৎসব। সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে পরিবেশিত হবে বাউল গান।
চারুকলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. তপন কুমার সরকার বলেন, প্রতিবছরের ন্যায় এবারও নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ বৈশাখকে বরণ করতে নানা আয়োজন করছে। আমাদের কার্যক্রম প্রায় শেষের পথে। যদিও কাজ আগের রাত পর্যন্ত চলবে। তবুও আমরা প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করে ফেলেছি। বৈশাখের শোভাযাত্রার যেই মূল লক্ষ্য থাকে, বাংলার ঐতিহ্যকে তুলে ধরা, সে লক্ষ্যেই এবারও আমরা কাজ করছি। এবারের আমাদের মূল মোটিফ হলো পায়রা, শান্তির প্রতীক। বর্তমান বিশ্বে যে যুদ্ধাবস্থা বিদ্যমান, আমরা চাই এসব যুদ্ধ দ্রুতই বন্ধ হোক এবং পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসুক।
চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহমিদা রিমঝিম বলেন, এ বছর তো সময় কম। এ কম সময়ের মধ্যেও আমরা যতটা ভালো করা সম্ভব, সে প্রস্তুতিই নিচ্ছি। আমাদের কাজও মোটামুটি শেষের দিকেই। এবার আনন্দ শোভাযাত্রার জন্য স্ট্রাকচারের কাজ করা হচ্ছে। এ ছাড়া মুখোশ, পেঁচা, পাখি, বাঘ, পালকি, আমাদের বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি। তো আশা করছি, ভালোভাবেই শেষ করতে পারব। সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজে রঙিন হয়ে উঠছে পুরো ক্যাম্পাস, অপেক্ষা এখন নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ১৪ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বরণ চত্বর থেকে জারুলতলা পর্যন্ত বৈশাখী শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শুরু হবে। পরে সকাল ১১টায় জারুলতলায় হবে বৈশাখের আলোচনা সভা। দুপুর ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্মুক্ত মঞ্চ, মুক্ত মঞ্চ, বুদ্ধিজীবী চত্বর ও চাকসু প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পুতুলনাচ, বলী খেলা, কাবাডি ও বউচি খেলা।
পরে দুপুর ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত বৈশাখী মঞ্চ জারুলতলায় হবে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। এরমধ্যে থাকবে জাতীয় সংগীত, বৈশাখের গান, নৃত্য ও লোকজ পরিবেশনা। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে মনোজ্ঞ সংগীতানুষ্ঠান। এছাড়া দিনব্যাপী আরও আয়োজনে থাকবে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা নাগরদোলা, পালকি, গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি ও বায়োস্কোপ প্রদর্শন।