শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড। আর সেই মেরুদণ্ড গঠনের দায়িত্ব যাদের কাঁধে, সেই শিক্ষকরাই বা শিক্ষকদের অভিবাবকরাই যখন দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন, তখন পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এমনই এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ মো. আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে চাকরি দেওয়ার নাম করে অর্থ আত্মসাৎ, মসজিদ পাশ করিয়ে দেয়ার নাম করে অর্থ আত্মসাৎ, মৃত শিক্ষকের নামে বেতন উত্তোলন, অতিরিক্ত ফি আদায়সহ নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের একাধিক লিখিত ও মৌখিক অভিযোগে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী মো. বেল্লাল উদ্দিন গত ২ মার্চ ২০২৬ তারিখে মির্জাগঞ্জ থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন (অভিযোগ নং: সিএল-১৫০)।

অভিযোগে বেল্লাল উদ্দিন বলেন, ২০০৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ৮ লাখ টাকার বিনিময়ে আমাকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১ মার্চ আমি যোগদান করি। পরে এমপিওভুক্ত করার কথা বলে আরও ৫ লাখ টাকা এবং আমার সকল মূল সনদপত্র জমা নেওয়া হয়।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, এরপর আর আমার বেতন চালু করা হয়নি। বরং আমাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে কলেজে যেতে নিষেধ করা হয়। আমার কোনো কাগজপত্রও ফেরত দেওয়া হয়নি। ২০০৫ সাল থেকে আমি মানবেতর জীবনযাপন করছি।

অধ্যক্ষ আব্দুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরও পদক্ষেপ নেয়। তথ্য গোপন, রেজুলেশন বই প্রদান না করা, বরখাস্ত ও পদত্যাগকৃত শিক্ষকদের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর নেওয়া এবং নিয়মবহির্ভূত নিয়োগের অভিযোগে ১৩ আগস্ট ২০২৩ তারিখে তার বেতন বন্ধ করা হয়। একই সঙ্গে তার এমপিও বাতিলের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক আব্দুস সালাম মোল্লা মৃত্যুবরণ করার পরও তার নাম এমপিও তালিকা থেকে বাদ না দিয়ে প্রায় ৬ বছর ধরে প্রায় ১০ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে পূর্বেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আরও কয়েকজন ভুক্তভোগী।
রকিবুল হাসান দেলোয়ার বলেন, একটি একাডেমিক ভবনের অনুমোদন এনে দেওয়ার কথা বলে আমার কাছ থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু কোনো কাজ করেননি। এখন ফোন দিলেও ধরেন না। বহুবার কলেজ ও বাড়িতে গিয়েছি, কিন্তু এড়িয়ে গেছেন।

রাফসান ইসলাম রাকিব বলেন, ২০১০ সালে আমার বাবার কাছ থেকে অফিস সহায়ক পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ১ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছিল। আজ পর্যন্ত টাকা ফেরত পাওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অভিযোগের প্রতিফলন দেখা গেছে। মো. আদনান ফরাজী অভিযোগ করেন, কলেজে ফরম ফিলাপের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৫ হাজার টাকার বেশি এবং প্রবেশপত্রের জন্য অতিরিক্ত ৬০০ টাকা নেওয়া হয়।


আরেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, চাকরি দেওয়ার কথা বলে আমাদের জমি পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে, কিন্তু চাকরি দেওয়া হয়নি, টাকাও ফেরত দেয়নি।
থানায় অভিযোগ করা ভুক্তভোগী বেল্লাল উদ্দিন জানান, বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন এবং আদালতের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। তার দাবি, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে এই পদের জন্য বিল করিয়েছেন ।
তিনি আরও বলেন, আমার কাছে নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র ও হাজিরা খাতার স্বাক্ষরসহ সব প্রমাণ রয়েছে। খুব শিগগিরই শিক্ষামন্ত্রী, দুদক, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ দেওয়া হবে।
অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান বলেন এটা একটা স্বরযন্ত্র! এটা নিয়ে বড় ধরনের মামলা হবে, আমরা তো কাঁচা লোক না, আমিও সাইজ করবোনে।
মির্জাগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আ. সালাম বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, অধ্যক্ষ আব্দুর রহমান কলেজের বিভিন্ন ফান্ডের টাকা ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে খরচ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে গেছেন। প্রশাসনিক নোটিশ এবং বিচারাধীন মামলার পরও অভিযুক্ত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না থাকায় জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে এ ধরনের অনিয়ম ও দূর্ণীতি আরও বিস্তার লাভ করতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।