পটুয়াখালী প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬ , আজকের সময় : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

পটুয়াখালীতে ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির আড়ালে চোরাকারবারি সিন্ডিকেটের অভিযোগ

পটুয়াখালীতে ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির আড়ালে অবৈধ পণ্য পরিবহন, রেনুপোনা পাচার ও চোরাকারবারিদের সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে মোঃ আরিফ হোসেন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। সম্প্রতি লেবুখালী টোল প্লাজায় অবৈধ রেনুপোনা বহনের অভিযোগে একটি ট্রাক ঘিরে সরাসরি লাইভ সম্প্রচারের ঘটনায় তার নাম নতুন করে আলোচনায় আসে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পটুয়াখালী পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আরিফ দীর্ঘদিন ধরে ট্রান্সপোর্ট লাইনের সঙ্গে জড়িত। নিজেকে রাজনৈতিক পরিচয়ে প্রভাবশালী হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি ধীরে ধীরে পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অবৈধ নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে পটুয়াখালী টোল প্লাজায় মোঃ শাহাবুদ্দিন এর মালিকানাধীন “হাওলাদার ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি” নামে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী হিসেবে নিয়োজিত আছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, ২০১৮ সালে আরিফ স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী শহীদ ভূঁইয়ার লাইনম্যান হিসেবে কাজ শুরু করেন। সে সময় তিনি গলাচিপা, কলাপাড়া, মহিপুরসহ উপকূলীয় অঞ্চলের মাছ ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরিচিতি গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যাশিত অর্থ না পেয়ে একপর্যায়ে তিনি শহীদ ভূঁইয়ার কয়েক লাখ টাকার মাছ গোপনে অন্যত্র বিক্রি করে দেন। ওই ঘটনার পর শহীদ ভূঁইয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

এরপর আরিফ ট্রান্সপোর্ট ব্যবসার সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হয়ে পড়েন। প্রথমে পটুয়াখালী টোল প্লাজা এলাকায় জুয়েল মৃধার মালিকানাধীন ট্রান্সপোর্ট এজেন্সিতে এবং পরে শাহীন মৃধার ট্রান্সপোর্ট এজেন্সিতে কাজ করেন। দীর্ঘদিন ট্রাক পরিবহন লাইনে থাকার সুবাদে তিনি কোন রুট দিয়ে কী ধরনের বৈধ-অবৈধ পণ্য পরিবহন হয়, কোথায় প্রশাসনিক চেকপোস্ট, কার সঙ্গে যোগাযোগ করলে ঝুঁকি কমে এসব বিষয়ে ব্যাপক ধারণা অর্জন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, ধীরে ধীরে তিনি অবৈধ পণ্য পরিবহনকারী চক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, যেসব ট্রাক অবৈধ রেনুপোনা, নিষিদ্ধ সময়ের সামুদ্রিক মাছ, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আনা বিদেশি পণ্য কিংবা বন বিভাগের অনুমতি ছাড়া কাঠ বহন করত, তাদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেন তিনি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, যারা তার সঙ্গে সমঝোতায় না আসে কিংবা অন্য ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করে, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে তথ্য দেওয়া হতো। এ কাজে কিছু অসাধু ব্যক্তিকে ব্যবহার করা হতো বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।

গত ২৮ মে (বৃহস্পতিবার) রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কয়েকজন সাংবাদিক ও স্থানীয় জনগণ লেবুখালী টোল প্লাজার ওজন স্কেলে অবস্থান নেন। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা মেট্রো-ড ১৪-৩৮৭৫ নম্বরের একটি ট্রাকে অবৈধ রেনুপোনা বহন করা হচ্ছিল।

সাংবাদিকরা লাইভ সম্প্রচার শুরু করলে ট্রাকে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি জানান, ট্রাকে থাকা রেনুপোনা কলাপাড়া ও কুয়াকাটার নদী ও সাগর এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তা বাগেরহাটে নেওয়া হচ্ছিল।

এ সময় হাওলাদার ট্রান্সপোর্ট এজেন্সির কর্মী পরিচয়ে মোঃ আরিফ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনি সাংবাদিকদের “চাঁদাবাজ” বলে চিৎকার করতে থাকেন এবং ট্রাকটি ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

বিজনেস বাংলাদেশের পটুয়াখালী প্রতিনিধি আবু রায়হান বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি কোটি টাকার অবৈধ রেনুপোনা পাচার হচ্ছে। পরে কয়েকজন সাংবাদিক ও স্থানীয় জনগণ নিয়ে পায়রা টোল প্লাজায় অবস্থান নেই। ট্রাকটি শনাক্ত করে লাইভ শুরু করলে আরিফ নামের এক ট্রান্সপোর্ট কর্মী এসে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করেন।”

তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন ও কালের কণ্ঠের প্রতিনিধিসহ একাধিক সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে মোঃ আরিফ হোসেন বলেন, “আমি হাওলাদার ট্রান্সপোর্ট এর মালিক। রাতে রাস্তায় থাকতেই পারি। সাংবাদিকরা এখানে কেন এসেছে? তারা ২০ হাজার টাকা চাঁদা নিয়েছে।” তবে তিনি কেন নিজের কর্মস্থল পটুয়াখালী টোল প্লাজার পরিবর্তে লেবুখালী টোল প্লাজায় উপস্থিত ছিলেন এ বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, উপকূলীয় অঞ্চলে অবৈধ রেনুপোনা আহরণ ও পাচার ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চোরাকারবারি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠায় দ্রুত প্রশাসনিক তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।