একটি দেশের ইতিহাস শুধু কিছু শুষ্ক রাজনৈতিক ঘটনার সমষ্টি নয়, বরং তা কিছু অনন্য মানুষের রক্ত, ঘাম আর আবেগের মহাকাব্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্বাধিকার আন্দোলন আর গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার ইতিহাস লিখতে গেলে যে কটি নাম আলো হয়ে জ্বলবে, তোফায়েল আহমেদ তাঁদের অন্যতম। গত ১ জুন, ২০২৬ তারিখে এই মহীরুহের প্রয়াণে অবসান ঘটল বাঙালির রাজনৈতিক আকাশের এক বর্ণিল নক্ষত্রের। তিনি কেবল একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ ছিলেন না; তিনি ছিলেন ইতিহাসের নির্মাতা এবং দূরদর্শী এক দার্শনিক।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলার গঙ্গাপুল ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে তোফায়েল আহমেদের জন্ম। মেঘনার পলিবিধৌত সেই দ্বীপাঞ্চলের শান্ত-স্নিগ্ধ প্রকৃতিতে কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর। বরিশাল ব্রজমোহন (বিএম) কলেজ পেরিয়ে পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নিলেও, তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ পাঠশালাটি ছিল তাঁর মায়ের কোল। তোফায়েল আহমেদের বিশাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের গভীরে যে কোমল ও সংবেদনশীল মানুষটির বাস ছিল, তার উৎস ছিল তাঁর মায়ের প্রতি অগাধ ভক্তি। মায়ের আশিসকে তিনি জীবনের পরম রক্ষাকবচ মনে করতেন। এই মাতৃভক্তিই পরবর্তীতে তাঁর মাঝে দেশমাতৃকার প্রতি এক সুগভীর ও চিরন্তন ভালোবাসায় রূপান্তরিত হয়েছিল। মায়ের প্রতি এই নিবিড় টান কতখানি অকৃত্রিম ছিল, তা প্রমাণ হয় তাঁর শেষ ইচ্ছায়—জগতের সমস্ত কোলাহল ফেলে তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত হতে চেয়েছেন তাঁর মায়ের কোলের মতো পবিত্র সেই কবরের পাশে।
তোফায়েল আহমেদের যৌবন ছিল বাঙালির অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে উৎসর্গীকৃত। ষাটের দশকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্ররাজনীতিতে তিনি এক ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হন। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনে তিনি মাঠপর্যায়ে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৮-৬৯ মেয়াদে তিনি ডাকসুর ভিপি এবং সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল এবং দার্শনিক অধ্যায় রচিত হয় ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি। রেসকোর্স ময়দানে ১০ লক্ষ মানুষের উত্তাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে মাত্র ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ ছাত্রনেতা বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। একটি উপাধি কীভাবে একটি জাতির মুক্তির মন্ত্র হয়ে উঠতে পারে, তোফায়েল আহমেদের সেই দূরদর্শী সিদ্ধান্তই তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে ‘মুজিব বাহিনী’ (BLF)-এর নেতৃত্ব দিয়ে অনন্য রণনৈপুণ্য দেখান।
স্বাধীনতার পর তোফায়েল আহমেদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম ট্র্যাজেডির পর দল যখন চরম সংকটে, তখন আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনে তিনি নিরলস কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার পাশে থেকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান সেনাপতি। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে তাঁর প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতায় পূর্ণ। তিনি বিভিন্ন মেয়াদে বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তোফায়েল আহমেদ জাতীয় নেতা হলেও তাঁর হৃদয়ের বিশাল অংশ জুড়ে ছিল তাঁর জন্মভূমি ভোলা। ভোলা-১ ও ভোলা-২ আসন থেকে তিনি বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। অবহেলিত, নদীভাঙনকবলিত ভোলাকে একটি আধুনিক ও উন্নত জনপদে রূপান্তর করার নেপথ্য কারিগর তিনি। রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবার যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন তিনি করেছেন, তা কেবল দায়িত্ববোধ থেকে নয়, বরং জন্মভূমির প্রতি এক আধ্যাত্মিক টান থেকে। ভোলার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক বটবৃক্ষের মতো, যার ছায়ায় মানুষ পরম নিশ্চিন্তে আশ্রয় পেত।
শেষ বিদায়: একটি যুগের অবসান
৮২ বছর বয়সে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই মহান নেতা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা সহজে পূরণ হবার নয়। তোফায়েল আহমেদ তাঁর বাগ্মিতা, অতুলনীয় সাংগঠনিক ক্ষমতা এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতি আজীবন অবিচল আনুগত্যের জন্য যুগ যুগ ধরে বাঙালিকে অনুপ্রাণিত করবে। মৃত্যু তাঁর পার্থিব জীবনের অবসান ঘটিয়েছে সত্যি, কিন্তু তাঁর কর্ম, আদর্শ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তাঁর অবদান এদেশের মানুষের হৃদয়ে চিরকাল ভাস্বর থাকবে। ইতিহাসের পাতায় তিনি বেঁচে থাকবেন এক অমর মহানায়ক হয়ে—মায়ের কোলে ঘুমানো এক চিরন্তন সন্তানের প্রতীক রূপে।
দ্রষ্টব্য: কোন মানুষই ভুল ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। তেমনি তিনিও হয়েতো ছিলেন না। তাই প্রতিটি মানুষের ভুল ত্রুটির মাঝেও সমাজ, দেশ ও জাতি গঠনে সে কতটুকু ন্যায়সঙ্গত এবং মঙ্গল কাজ করেছেন তা বিচার্য হতে পারে। তার বিদেহী আত্মার মুক্তি কামনা করছি। পরিবারের প্রতি জানাচ্ছি সমবেদনা।
লেখক: গোপাল চন্দ্র মজুমদার
সিনিয়র ম্যানেজার (ব্রান্ড এন্ড প্রমোশন)
মাগুরা গ্রুপ।