বেক্সিমকো গ্রুপের মালিকানাধীন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে নীরব ক্যু হয়েছে। শীর্ষ পদে ডজনখানেকসহ ৩০ সাংবাদিক ও কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। যার সুফল পেয়েছে মূলত পলাতক হাসিনার একান্ত অনুগতরা ও শিবির কর্মীরা। আর তাদের মাধ্যমে চ্যানেলটির সব ধরনের নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত হয়েছে শামসুর রহমান মোমেনের হাতে। ৫ আগস্টে যাদের তৎপরতায় স্টেশনটি রক্ষা পেয়েছে তাদের ক্ষমতাহীন করা হয়েছে।
প্রায় এক বছর দুবাইয়ে পালিয়ে থাকার পর সম্প্রতি দেশে ফেরেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সিইও এম শামসুর রহমান মোমেন। স্বৈরশাসক গোষ্ঠীর তল্পীবাহক এই ব্যক্তি বিগত দেড় দশক ধরে স্টেশনটির প্রধান নির্বাহীর পদ ধরে রেখেছেন কুখ্যাত সালমান এফ রহমানের নানা রকম অপকর্ম বা এজেন্ডা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে। তার বিরুদ্ধে রয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগ। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ৫ আগস্টে পর তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে দুদক, সংস্থাটির আবেদনে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিষেধাজ্ঞা জারির একদিন আগেই খবর পেয়ে দুবাই পালিয়ে যান তিনি। সেখানে অবস্থান করেন এক বছরের বেশি সময়।
দুবাইতে তার বিনিয়োগ রয়েছে বলেও জানা গেছে, পাশাপাশি সেখানে বসবাসের রেসিডেন্স পারমিটও গ্রহণ করেছেন। সালমান এফ রহমানের পরিবার ও বেক্সিমকো গ্রুপের সাথে শেয়ারবাজার জালিয়াতি, ব্যাংক ঋণ আত্মসাৎ এবং হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে।
মোমেন নিউজরুমে তার আস্থাভাজনদের বলে বেড়াচ্ছেন, বিপুল অর্থ দিয়ে তিনি বিএনপির সাথে আঁতাত করে ফেলেছেন। এদিকে দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার বিরুদ্ধে হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের তথ্য মিলেছে। তিনি তিনিসহ ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির তিন কর্মকর্তার অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে বিস্ফোরক তথ্য প্রকাশ হয়েছে ‘বাংলা আউটলুক’-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। এতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির সিইও এম শামসুর রহমান মোমেন, তার স্ত্রী সাবরিনা জামান, হেড অব নিউজ মামুন আব্দুল্লাহ, তার স্ত্রী রিফাতে এলাহী এবং টকশো উপস্থাপক আশিস সৈকতের নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠে এসেছে।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশি হামলার খবর নিয়ন্ত্রণ করতেন শামসুর রহমান। আন্দোলন চলাকালীন সময়ে নিউজরুমের সাংবাদিকদের দিয়ে বিভিন্ন উপায়ে আন্দোলন নস্যাৎ করার জন্য প্রোপাগান্ডা চালানো হয়েছে তার নির্দেশে। এমনকি গণভবনকে খুশি করতে আন্দোলনের বিরুদ্ধে ডকুমেন্টারি বানিয়ে নিজের স্ত্রীকে দিয়ে ইংরেজিতে ডাবিং দিয়ে বিভিন্ন দূতাবাস, অনলাইন ও গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছিলো। যার প্রমাণ মিলেছে সজীব ওয়াজেদ জয়ের দেয়া ফেসবুক পোস্টে।
এছাড়াও গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশেষ টকশোর মাধ্যমে ছাত্র আন্দোলনকে বিএনপি জামাতের আন্দোলন হিসেবে প্রচারে প্রভাবিত করেছেন তিনি। সেইসব টকশোর ক্লিপ দিয়ে মোমেনের অপকর্মের বহু নিউজ হয়েছে। নিয়েই সম্প্রতি তিনি দেশে ফিরেছেন। এসেই তার আস্থাভাজন আরেক আওয়ামী সুবিধাভোগী দোসর হেড অব নিউজ মামুন আব্দুল্লাহকে নিয়ে আওয়ামী সংশ্লিষ্ট ১৭ সাংবাদিককে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করেন। স্বৈরাচার বিরোধী ও বিএনপি পন্থীদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বহাল তবিয়তের জানান দেন।
হেড অফ নিউজ মামুন আব্দুল্লাহ বহাল: ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের হেড অব নিউজ মামুন আব্দুল্লাহ। ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম প্রতিনিধি থেকে সরাসরি হেড অব নিউজ বনে যান সিইও এম শামসুর রহমান মোমেনের আশীর্বাদে। তিনি মুলত মোমেনের ব্যক্তিগত সহযোগী ও অনুগত। আওয়ামী ঘরানার সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত মামুন আব্দুল্লাহর ভুয়া সাংবাদিকতায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন সেই সময় চট্টগ্রামের বিএনপি নেতারা। ৫ আগস্ট ছাত্র আন্দোলনে আওয়ামী লীগের হয়ে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছেন টেলিভিশনে। ছাত্রদের আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন লাইভ টকশোতে। নিউজরুমের সাংবাদিকদের বাধ্য করেছেন ছাত্রদের বিরুদ্ধে ভুয়া প্রতিবেদন তৈরি করতে।
টকশোতে ন্যারেটিভ তৈরিতে একাধিকবার নিজেই বসেছেন টকশোর চেয়ারে। যার প্রমাণ রয়েছে এখনো। মামুন আব্দুল্লাহকে সরিয়ে দিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা আন্দোলনও করেছে। এমনকি তাকে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিউজ হয়েছে ব্যাপক। কিন্তু ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সিইওর ব্যক্তিগত সহযোগী হিসেবে বারবারই তিনি পার পেয়ে গেছেন।
প্রথম আলোয় থাকাকালে মামুন আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধে দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় বিএনপির বিরুদ্ধে ভুয়া নিউজ এর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ আছে। সেই সময়ের এনএসআই কর্মকর্তা রেজাকুল হায়দার মামুন আব্দুল্লাহর সব অপকর্ম ও আওয়ামী স্বার্থ রক্ষার তথ্য গণমাধ্যমে ফাঁস করেছেন সম্প্রতি।
এ নিয়ে এক ঘন্টার উপরে একটি ভিডিও ইন্টারভিউ আছে আমার দেশ পত্রিকার ইউটিউব চ্যানেলে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার নথিতে তিনি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীদের পক্ষে এবং ভারতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত। তারও দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আছে। এছাড়া মামুন আব্দুল্লাহ ২০১৪ থেকে এ পর্যন্ত ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনে কর্মরত অন্তত ১০ জন বিএনপিপন্থী সাংবাদিককে চাকরি হতে সরে যেতে সরাসরি ভূমিকা রেখেছেন।
সচিবালয় বিটের অযোগ্য সাংবাদিক হাসিফ মাহমুদ শাহ এর সাথে আঁতাত করে সচিবালয়ের বিভিন্ন ব্রিফিং এর তথ্য আওয়ামী নেতাদের কাছে পাচার ও তদবির বাণিজ্য চালিয়ে আসছেন। আর এ সব কিছুই সম্ভব হচ্ছে সিইও মোমেনের পৃষ্ঠপোষকতায়। ছাত্র আন্দোলনকে জঙ্গি ট্যাগ দেওয়া, অনিয়ম-দুর্নীতি, অন্যায়-অবিচারের শত শত অভিযোগ থাকলেও, বিভিন্ন জায়গা থেকে তাকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি উঠলেও মামুন আব্দুল্লাহ ঠিকই রয়েছেন বহাল তবিয়তে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের হেড অব নিউজ হিসেবে।
মাহমুদ শরীফ:
আত্মস্বীকৃত শিবির কর্মী। ছিলেন শিবিরের সাথী। বিএনপি বিটে সাংবাদিকতার সুবাদে একসময় নিজেকে বিএনপিপন্থী দাবি করতেন। আর এই বিএনপি বিটকেই তিনি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে বিগত সংসদ নির্বাচনের সময় সে তার জামায়াত পরিচয় প্রকাশে এনেছে।
পাঁচ আগস্ট পরবর্তী বিভিন্নভাবে বিএনপি’র বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছেন শিবির কর্মী হবার কারণে। আওয়ামী লীগের দোসরদের পুনর্বাসন প্রতিশ্রুতি দিয়ে কামিয়েছেন কোটি টাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিএনপি নেতাদের নাম করে প্রভাব খাটিয়ে চালিয়েছেন নিয়োগ বাণিজ্য।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের টকশোতে আওয়ামী দোসর প্রমাণিত মামুন আব্দুল্লাহকে পুনর্বাসনও সিইও শামসুর রহমান মোমেনকে পলাতক অবস্থায় দুবাই থেকে ফিরিয়েছেন বিএনপি নেতাদের নাম করে টাকার বিনিময়। ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের বড় কর্মকর্তাদের এই সুরক্ষার বদলে তাকে হেড অফ ইনপুটের পদ দেয়া হয়েছে। যদিও তার যোগ্যতা বড়জোর সিনিয়র রিপোর্টার হওয়ার।
(তথ্য সূত্র: সাংবাদিক রুস্তুম মল্লিক)
Print [1]