নিজস্ব প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬ , আজকের সময় : রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬

৩৬৯ কোটি টাকার সড়কবাতি প্রকল্পে অন্তহীন প্রশ্ন

দুই বছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল, ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৬৯ কোটি টাকা। লক্ষ্য ছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে আধুনিক, জ্বালানি-সাশ্রয়ী ও প্রযুক্তিনির্ভর আলোকসেবার আওতায় আনা। কিন্তু ছয় বছর পর প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও থামেনি বিতর্ক। বাতির মূল্য নির্ধারণে অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ, স্মার্ট প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন, ওয়ারেন্টি থাকা সত্ত্বেও রক্ষণাবেক্ষণে অতিরিক্ত খরচ এবং সেবাবঞ্চিত এলাকার অভিযোগ-সব মিলিয়ে আলোচনায় ডিএনসিসির ‘স্মার্ট এলইডি স্ট্রিট লাইটিং’ প্রকল্প। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য বলছে, সাবেক প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামের দায়িত্বকালে বাস্তবায়িত প্রকল্পটির বিভিন্ন দিক এখন নতুন করে খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

তথ্য বলছে, ২০১৭ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি ২০১৯ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সময় বাড়তে বাড়তে প্রকল্পের কাজ শেষ হয় ২০২৩ সালে। প্রকল্পের আওতায় মোট ৪৬ হাজার ৪১০টি এলইডি সড়কবাতি স্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা বা সেন্ট্রাল কন্ট্রোল অ্যান্ড মনিটরিং সিস্টেম (সিসিএমএস) স্থাপনের পরিকল্পনাও ছিল। তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক ছিলেন ডিএনসিসির সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। প্রকল্প অনুমোদনের সময় বলা হয়েছিল, এটি বাস্তবায়িত হলে উত্তর সিটির সড়কগুলো আরও নিরাপদ ও আধুনিক হবে। প্রশ্ন উঠছে-প্রকল্পটি কি তার ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে?

প্রকল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়-এমন কিছু এলইডি বাতির মূল্য প্রকল্পে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেখানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বাজারদর ও প্রকল্পমূল্যের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি বিস্তারিতভাবে যাচাই করা দরকার।’ তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় আমদানি ব্যয়, কর, পরিবহন খরচ, প্রযুক্তিগত মান এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় যুক্ত ছিল কিনা, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় সরকার খাতের একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, বাজারমূল্য এবং প্রকল্পমূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকলে সেটি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে। এ ধরনের ক্ষেত্রে স্বাধীন মূল্যায়ন জরুরি।

একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হলেও প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র বলছে, বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা ছিল। সরঞ্জাম সরবরাহ, প্রযুক্তি স্থাপন এবং কিছু কারিগরি কাজ করা হয়। কাগজে-কলমে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে বাতি নিয়ন্ত্রণ, ত্রুটি শনাক্ত এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য পর্যবেক্ষণের কথা ছিল। সরেজমিনে কয়েকটি এলাকা ঘুরে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।

একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রযুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। তবে এর সব সুবিধা মাঠপর্যায়ে কতটা ব্যবহার হচ্ছে, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ বিভাগের আরেক কর্মকর্তা বলেন, যে প্রযুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয়ভাবে পুরো ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণের কথা ছিল, সেটি বর্তমানে কতটা কার্যকর অবস্থায় আছে, সেটি পরীক্ষা করে দেখা দরকার।

উত্তরখানের কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রধান সড়কগুলোতে আলোর ব্যবস্থা আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভেতরের কিছু সড়ক এখনও পর্যাপ্ত আলোকসুবিধার বাইরে রয়েছে।

উত্তরখানের বাসিন্দা মো. হানিফ বলেন, বড় রাস্তায় আলো আছে। কিন্তু অনেক ভেতরের রাস্তা এখনো অন্ধকার থাকে। রাত হলে চলাফেরায় সমস্যা হয়।

দক্ষিণখানের ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক বলেন, কোটি টাকার প্রকল্প হয়েছে শুনেছি। কিন্তু সব এলাকায় সমান সুবিধা গেছে কিনা, সেটা নিয়ে মানুষের প্রশ্ন আছে।

হরিরামপুরের এক বাসিন্দা বলেন, অনেক জায়গায় উন্নতি হয়েছে। কিন্তু কিছু এলাকায় এখনও আলোর ঘাটতি রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, প্রকল্পের সুবিধা সব এলাকায় সমানভাবে পৌঁছেছে কিনা, সেটিও মূল্যায়নের বিষয়।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, স্থাপিত বাতিগুলোর নির্দিষ্ট সময়ের ওয়ারেন্টি সুবিধা ছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পরবর্তী সময়ে কিছু রক্ষণাবেক্ষণ কাজ এবং বাতি পরিবর্তনের জন্য সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকেও অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এ নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এক কর্মকর্তা বলেন, ওয়ারেন্টির আওতায় কী কী কাজ হওয়ার কথা ছিল এবং পরবর্তীতে কোন খাতে কত অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তবে, প্রকল্পটির বেশিরভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামের দায়িত্বকালে। প্রকল্পের ব্যয়, সময় বৃদ্ধি, প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে বর্তমানে যে প্রশ্নগুলো উঠছে, তার বড় অংশই ওই সময়ের সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ব্যয়, প্রযুক্তিগত কার্যকারিতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, যেসব বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলো যাচাই করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করা হবে।

অবকাঠামো ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে শুধু কাজ শেষ হলেই হবে না। প্রকল্পের কার্যকারিতা, সেবার মান এবং ব্যয়ের যৌক্তিকতাও মূল্যায়ন করতে হবে।

​ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, নাগরিকরা প্রকল্পের প্রকৃত সুফল পাচ্ছেন কিনা, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। যেকোনো বড় প্রকল্পে স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন করা হলে বিতর্ক কমে এবং জবাবদিহি বাড়ে।

প্রকল্পের বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রশ্নের বিষয়ে জানতে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলামের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। ফোন, খুদে বার্তা এবং হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। কল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পক্ষের কাছ থেকেও এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ৩৬৯ কোটি টাকার এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল রাজধানীর উত্তর অংশকে আরও নিরাপদ, আধুনিক ও আলোকিত করা। কিছু এলাকায় সেই পরিবর্তন দৃশ্যমানও হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ব্যয়, প্রযুক্তির কার্যকারিতা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং সেবার সমতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর উত্তরও জানতে চান নগরবাসী। একটি সড়কবাতি প্রকল্প শুধু আলো জ্বালানোর বিষয় নয়; এটি জনগণের অর্থ, নগরসেবা এবং জবাবদিহির সঙ্গেও জড়িত। আর সেই কারণেই, আলোর এই প্রকল্পের ওপর এখনো রয়ে গেছে অন্ধকারের ছায়া।