সরকারের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও নীতিনির্ধারণী পদে থাকার সুবাদে ক্ষমতার অপব্যবহার, শুল্ক ফাঁকির সিন্ডিকেট তৈরি এবং পদ-পদবির অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক ও আবগারি বিভাগের সাবেক সদস্য এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) শহিদুল ইসলাম। ত
অতি সম্প্রতি দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনি ঝামেলা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সম্ভাব্য চোখ এড়াতে তিনি এক অভিনব চাতুরীর আশ্রয় নিয়েছেন। হঠাৎ গুরুতর অসুস্থতার বাহানা তৈরি করে নিজের স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বি এবং ছোট ছেলেকে নিয়ে গোপনে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন তিনি। একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে, আইনি জটিলতার কারণে তার আর দেশে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই এবং তিনি মূলত দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন।
চাকরি জীবনে শহিদুল ইসলাম কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালের সদস্য এবং ঢাকার পশ্চিম জোনের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারের মতো সরকারের একাধিক লোভনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ২০১০ সালের পর থেকে এসব চেয়ারে বসেই তিনি বিভিন্ন আমদানিকারক সিন্ডিকেট ও বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ শুল্ক রেয়াত বা কর ফাঁকির অবৈধ সুযোগ করে দিয়ে এই বিপুল সম্পত্তি অর্জন করেন।
কাস্টমস ক্যাডারের একই গ্রেডের একাধিক প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার মতে, দীর্ঘ চাকরি জীবনে সমস্ত বেতন, সরকারি স্কলারশিপ, বিদেশ সফর এবং অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা মিলিয়ে একজন সৎ কর্মকর্তার পক্ষে সর্বোচ্চ আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা সঞ্চয় করা সম্ভব। কিন্তু শহিদুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর নামে অর্জিত সম্পত্তি তাদের বৈধ আয়ের চেয়ে অন্তত একশত গুণ বেশি, যা কোনোভাবেই চাকরি জীবনের বৈধ আয় দিয়ে মেলানো সম্ভব নয়।
চতুর এই কর্মকর্তা কেবল দেশেই সম্পদ গড়েননি, বরং তার অর্জিত কালো টাকা হুন্ডির মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে পাচার করেছেন। তার দুই জমজ ছেলে কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চশিক্ষা শেষ করে সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। মানুষের চোখ এড়ানোর জন্য তারা বিদেশে ভাড়া বাসায় থাকার নাটক করলেও বাস্তবে কানাডায় তাদের নিজেদের নামে দুটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে, যা থেকে প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ টাকা ভাড়া বাবদ আয় হয়। এছাড়া অস্ট্রেলিয়াতেও তাদের নিজস্ব রাজকীয় আবাসন রয়েছে এবং দুবাইতে রয়েছে বড় ধরনের স্বর্ণের চোরাচালান ও জুয়েলারি ব্যবসা।
শুধু তাই নয়, নিজের চেয়ার ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে আপন ভাই সেলিমকে চট্টগ্রামে সিঅ্যান্ডএফ এর দুটি লাইসেন্স পাইয়ে দিয়েছেন, যা দিয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সিন্ডিকেট পরিচালনা করা হয়েছে। তার ছোট ভাই জাকিরের নামেও রয়েছে সমপরিমাণ বিপুল অবৈধ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি।
বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের পাশাপাশি দেশের মাটিতেও এই দম্পতি দৃশ্যমান সম্পদের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। অনুসন্ধানে পাওয়া তাদের উল্লেখযোগ্য কিছু সম্পদের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
বসুন্ধরায় ১০ তলা ভবন: রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকা বসুন্ধরার জি ব্লকে ১০তলা একটি বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করেছে এই দম্পতি, যার নাম ‘শেল কবিতা’। প্রতি ফ্লোরে আড়াই হাজার বর্গফুটের দুটি করে ফ্ল্যাট সম্বলিত এই ২০ ফ্ল্যাটের পুরো ভবনটিই তাদের নিজস্ব মালিকানাধীন। জমিসহ এই ভবনের বর্তমান বাজারমূল্য কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকা।
বাংলামোটরে ফ্ল্যাট: বাংলামোটর এলাকার স্বজন টাওয়ারে সহিদুলের নিজ নামে দুটি ফ্ল্যাট রয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা।
বাণিজ্যিক দোকান: শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় এবং নিউমার্কেটে তার নামে থাকা দুটি বাণিজ্যিক দোকানের বাজারমূল্য ৪ কোটি টাকারও বেশি।
শেয়ারবাজার ও ব্যাংক ব্যালেন্স: তার স্ত্রী ফাহমিদা রাব্বির নামে শেয়ারবাজারে একটি বিও অ্যাকাউন্টে প্রায় ৮০ কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ রয়েছে এবং সোনালী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে নগদ ৫৫ লাখ টাকা জমা রয়েছে।
ছেলের ব্যবসার পুঁজি: নিজের বড় ছেলে হাসিন ফারহানের ব্যবসার জন্য বসুন্ধরার বিলাসবহুল জেসিএক্স বিজনেস টাওয়ারে রাজকীয় অফিস খুলে দিয়েছেন এবং ভেলোসিটি গ্রুপের অধীনে মাল্টিপল এজেন্সির মূল পুঁজি হিসেবে নগদ ৫ কোটি টাকা প্রদান করেছেন।
শহিদুল ইসলামের এই লাগামহীন দুর্নীতি ও রাতারাতি শত কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার বিষয়টি দেশের সচেতন মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই বিষয়ে দুদকের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সুনির্দিষ্ট তথ্যসহ অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
শহিদুল ইসলামের দুর্নীতির এই বিশাল ফাইল এখন তদন্তকারী সংস্থাগুলোর টেবিলে জমা পড়ার অপেক্ষায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।