পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ ইউনিয়ন দরগাহ শরীফ মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘিরে ওঠা একাধিক গুরুতর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট নথির ফরেনসিক যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সাংবাদিক মো. মনজুর মোর্শেদ তুহিন। অভিযোগের অনুলিপি মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছেও পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে নাবালিকা ছাত্রীকে বিয়ে করে একসঙ্গে বসবাস, এক শিক্ষিকার বিরুদ্ধে জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি গ্রহণ, এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর বিরুদ্ধে জাল শিক্ষাগত সনদে নিয়োগ এবং এসব অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে গেলে সাংবাদিকদের লোহার হাতুড়ি উঁচিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
অভিযোগের বিষয়গুলো যাচাই করতে গিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে একাধিক প্রশ্ন, অসঙ্গতি ও নতুন তথ্য:
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৩ সালে ছবি রানী খাসকেল বিদ্যালয়ে হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। বিদ্যালয়ের সংরক্ষিত নথি অনুযায়ী, নিয়োগের সময় তিনি তিন বছর মেয়াদি কাব্যতীর্থ সনদ দাখিল করেন। নথিতে ১৯৯৬ সালে আদ্য, ১৯৯৭ সালে মধ্য এবং ১৯৯৮ সালে আদ্য-মধ্য ও উপাধি সনদ অর্জনের তথ্যও রয়েছে।
তবে ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর তার বিরুদ্ধে জাল সনদে চাকরি নেওয়ার অভিযোগ উত্থাপিত হলে তদন্তের দায়িত্ব পান উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম। নির্ধারিত সাত কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সম্পন্ন না করে প্রায় ছয় মাস পর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে একটি প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে নিয়োগ কমিটির একটি রেজুলেশনের কথা উল্লেখ করা হলেও অনুসন্ধানে ওই রেজুলেশনের মূল কপি পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, রেজুলেশনে থাকা স্বাক্ষরগুলোও প্রকৃত সদস্যদের নয়। এছাড়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছাড়া আবেদন করার কোনো সুযোগ ছিল না।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, তদন্তে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, নিয়োগ কমিটির জীবিত সদস্য কিংবা মূল রেজুলেশনের সত্যতা যাচাইয়ের কোনো সুস্পষ্ট তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ নেই। ফলে তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে মির্জাগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “মূল অভিযোগকারী লিটন শিকদার তার অভিযোগ প্রত্যাহার করেছেন এবং মির্জাগঞ্জ ছাড়াও আরও দুটি উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব থাকায় যথাসময়ে প্রতিবেদনটি দেওয়া সম্ভব হয়নি।”
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আইসিটি শিক্ষক মো. সোহেল ২০২৩ সালে এনটিআরসিএর মাধ্যমে বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, যোগদানের পর একই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী রাবেয়া আক্তারের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে এসএসসি পরীক্ষার আগে কয়েকদিন আত্মগোপনের পর সামাজিক চাপে স্থানীয়ভাবে এফিডেভিটের মাধ্যমে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।
বর্তমানে তারা একসঙ্গে বসবাস করছেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। তবে এ বিষয়ে সরকারি তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।
রাবেয়ার পিতা মোহাম্মদ আবুল শরীফ বলেন, “প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ায় এফিডেভিট করে বিয়ে দিয়েছি। আমার মেয়ে সোহেলের গ্রামের বাড়ি পাথরঘাটায় থাকে। এক বছর আগে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ বলেন, “শিক্ষক সোহেলের এমন কর্মকাণ্ড স্কুল ও এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ছাত্রীরা শিক্ষকের কাছে কন্যার মতো। সোহেল মাস্টারের এমন কর্মকাণ্ডে স্কুলের সুনাম নষ্ট হয়েছে।”
অনুসন্ধানকালে আরও জানা যায়, বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মো. জলিল গোলদার নিয়োগের সময় অষ্টম শ্রেণির জাল সনদ ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রেজিস্টার যাচাই করে ওই শিক্ষাবর্ষে মো. জলিল গোলদার নামের কোনো শিক্ষার্থীর তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট নথি আরও যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মো. জলিল গোলদারের কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিদ্যালয়ে তথ্য অনুসন্ধানের সময় তিনি সাংবাদিকদের লোহার হাতুড়ি দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়।
গত ৫ জুলাই অভিযোগগুলোর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে গেলে সাংবাদিক মো. মনজুর মোর্শেদ তুহিন ও বাদল হোসেনের সঙ্গে অসদাচরণ, দেখে নেওয়ার হুমকি এবং লোহার হাতুড়ি উঁচিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে। সাংবাদিকদের মুঠোফোনেও হুমকির ভিডিও ধারণ করা হয়েছে, যা বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, “জলিল কাকা ঘণ্টা পেটানোর হাতুড়ি হাতে নিয়ে বারান্দায় চিৎকার-চেঁচামেচি করছিল। তখন আমি ও আমার সহপাঠীরা দেখে ভয় পেয়েছিলাম।”
প্রধান শিক্ষক মো. শাহ আলম বলেন, “ঘটনার সময় আমি বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিলাম। এটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত। আমার মেহমানদের সঙ্গে এমন আচরণ হবে, তা কখনো কল্পনা করিনি। তথ্য অনুসন্ধানে যেকোনো সাংবাদিককে সহযোগিতা করা আমার কর্তব্য।”
হুমকির ঘটনার পর জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হলে মির্জাগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সাংবাদিকদের নিরাপদে বের করে দেয়। পরে এ ঘটনায় মির্জাগঞ্জ থানায় জিডি নং-১৯১ (তারিখ: ০৫ জুলাই ২০২৬) দায়ের করা হয়।
বিদ্যালয়কে ঘিরে ধারাবাহিক অভিযোগে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
মো. আমির হোসেন বলেন, “আমি এই স্কুলের শিক্ষার্থী ছিলাম। এছাড়াও অসংখ্য শিক্ষার্থী এই স্কুল থেকে সুনামের সঙ্গে পাস করে সরকারি-বেসরকারি বহু বড় পদে চাকরি করছেন। জাল সনদ কিংবা নাবালিকা বিয়ের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত কেউ স্কুলে থাকলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট হবে এবং ভালো শিক্ষার্থীরা মুখ ফিরিয়ে নেবে।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অভিভাবক বলেন, “সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, জাল সনদে চাকরি ও নাবালিকা ছাত্রীকে বিয়ের অভিযোগ উঠেছে। এই স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া আমার একটি মেয়ে আছে। যদি ঘটনা সত্য হয়, তাহলে আমি আমার মেয়েকে মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেব।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭, বাংলাদেশ দণ্ডবিধির জালিয়াতি ও প্রতারণাসংক্রান্ত ধারা, ভয়ভীতি প্রদর্শনসংক্রান্ত বিধান এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল নিয়োগ বিধিমালার আওতায় বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মুজিবুর রহমান বলেন, “এর আগেও ওই স্কুলের শিক্ষিকার বিষয়ে অভিযোগ ছিল, যার একটি প্রতিবেদন পেয়েছি। এখন সাংবাদিকদের সঙ্গে অসদাচরণসহ শিক্ষক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নতুন কিছু অভিযোগ পেয়েছি। বিধি অনুযায়ী তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বিদ্যালয়ের সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মো. রাসেল বলেন, “তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য প্রধান শিক্ষককে বলা হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
(শীঘ্রই আসছে-২য় পর্ব)