মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) ঢাকা মেট্রোর উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে পাহাড় সমান অভিযোগ থাকলে বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ঘুষ আদায়, জব্দ করা মাদক ও নগদ অর্থের প্রকৃত পরিমাণ গোপন, নিরীহ মানুষকে মাদক মামলায় জড়ানো এবং বিভিন্ন বার ও সিসা লাউঞ্জ থেকে মাসোহারা আদায়ের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ডিএনসি। একই সঙ্গে তাঁকে প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। ৬ জুলাই ডিএনসির পৃথক দুটি অফিস আদেশে এসব তথ্য জানা গেছে।
অফিস আদেশ অনুযায়ী, আবুল খায়ের নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, নারায়ণগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় তিনটি মাদকবিরোধী অভিযানের তথ্য তিনি উত্তরা সার্কেলের পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান এবং বিমানবন্দর সার্কেলের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোহাম্মদ রোকুনুজ্জামানকে দিয়েছিলেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত তিনটি অভিযানে এক হাজার ৮০০ পিস ইয়াবা, ৪০০ গ্রাম হেরোইন, ২০ হাজার পিস ইয়াবা এবং দুই লাখ ৯৭ হাজার টাকা উদ্ধার হলেও সংশ্লিষ্ট মামলায় উদ্ধার হওয়া আলামত ও নগদ অর্থের প্রকৃত পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, তথ্যদাতা হিসেবে চুক্তি অনুযায়ী তিনি সোর্সমানিও পাননি। আবুল খায়েরের দাবি, পশ্চিম সানারপাড়ের একটি অভিযানে ৫৪ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধারের কথা দেখিয়ে বাকি দুই লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে। পাশাপাশি জব্দ করা ইয়াবা ও হেরোইনের একটি অংশ গোপন করা, টাকার বিনিময়ে নিরীহ মানুষকে আসামি করা এবং প্রকৃত অপরাধীদের ছাড় দেওয়ার অভিযোগও তিনি করেছেন। বর্তমানে এসব তথ্য প্রকাশ করায় নিজের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কার কথা জানিয়েছেন তিনি। ডিএনসি জানিয়েছে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে পরিচালক (নিরোধ, শিক্ষা, গবেষণা ও প্রকাশনা) রাজীব আহসানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম শওকত ইসলাম, উপপরিচালক (অপারেশনস) মুকুল জ্যোতি চাকমা এবং সদস্যসচিব হিসেবে সহকারী পরিচালক (অপারেশনস) ফয়সাল মাহমুদ। কমিটিকে সরেজমিন তদন্ত করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
পৃথক আরেকটি অফিস আদেশে পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ডিএনসির প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তবে অভিযোগগুলো এবারই প্রথম নয়। এর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, জব্দ করা আলামত কম দেখানো, বিভিন্ন মদের বার ও সিসা লাউঞ্জ থেকে মাসোহারা আদায় এবং ‘ফিটিং বাণিজ্য’ নামে পরিচিত কৌশলে নিরীহ মানুষকে মাদক মামলায় জড়িয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এসব অভিযোগের বিষয়ে একাধিকবার অনুসন্ধান ও তদন্ত হলেও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে শাস্তির পরিবর্তে কেবল বদলি করেই দায়িত্ব শেষ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৭ সালের ১০ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি তদন্ত প্রতিবেদনেও দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের নাম উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কর্মরত অবস্থায় জিল্লুর রহমানসহ ছয়জন কর্মকর্তা ও সদস্য মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বিভিন্ন ঘটনায় অর্থ আদায়ের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে তাঁর সঙ্গে তৎকালীন এসআই জুলহাস আহমেদ, এএসআই সানাউল্লাহ এবং সিপাহি আনোয়ার হোসেন, জিয়াউল হক ও আমজাদের নামও উল্লেখ করা হয়। তদন্তে অন্তত চারটি মাদক-সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
এ বিষয়ে পরিদর্শক দেওয়ান মোহাম্মদ জিল্লুর রহমানের সাথে তার মুঠোফোনে বার বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।