নিজস্ব প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬ , আজকের সময় : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

ঝিনাইদহের ‘সিও’ এনজিওর কর্মচারীদের অভিযোগ চাকরি ছাড়লেই মামলা! শিশু সন্তান নিয়ে পথে পথে সাবেক ম্যানেজার মাহবুব

ঝিনাইদহের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা সোশ্যাল এমপাওয়ারমেন্ট এন্ড হিউম্যান এফোর্ট অর্গানাইজেশন (সিও)-এর বিরুদ্ধে সাবেক এক শাখা ব্যবস্থাপককে শারীরিক নির্যাতন, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়, ফাঁকা স্ট্যাম্প ও চেকে স্বাক্ষর নেওয়া, পরে বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের এবং সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগকারী এ বি এম মাহবুব রহমান, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার বাসিন্দা।

তিনি ২০২২ সালের ৫ ডিসেম্বর সিও এনজিওর ফরিদপুর সদর শাখার ব্যবস্থাপক হিসেবে যোগদান করেন।

লিখিত অভিযোগ, আদালতের নথি, থানায় দায়ের করা অভিযোগ, অডিট রিপোর্ট, এমআরএর তদন্তসংক্রান্ত কাগজপত্র, চিকিৎসা নথি এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দলিল পর্যালোচনায় জানা যায়, শাখায় অস্বাভাবিক হারে কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলির কারণে ঋণের কিস্তি আদায়ে সমস্যা দেখা দেয়। এতে প্রায় ৯ লাখ টাকা বকেয়া হয়।

চাকরি রক্ষার আশায় পরিবারের কাছ থেকে ১ লাখ টাকা এনে অফিসে জমা দিলেও বাকি অর্থের জন্য তার ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

মাহবুব রহমানের অভিযোগ, ২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট সন্ধ্যায় ফিল্ড কাজ করার সময় তাকে অফিসে ডেকে নেওয়া হয়। অফিসে প্রবেশের পর তার দুটি মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর কয়েকজন কর্মকর্তা তাকে আট লাখ টাকার দায় স্বীকার করতে চাপ দেন।

তিনি অস্বীকৃতি জানালে তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়।

অভিযোগে বলা হয়, পরে সাত পৃষ্ঠার সাদা কাগজে বিভিন্ন বক্তব্য লিখিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে অর্থ আত্মসাতের কথা মুখে বলিয়ে ভিডিও ধারণ করা হয়। এছাড়া ফাঁকা স্ট্যাম্প, চেক ও অন্যান্য কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। তার মোটরসাইকেলও লিখে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।

মাহবুব রহমানের দাবি, পরে ওই ফাঁকা স্ট্যাম্পে ২৯ লাখ টাকার অঙ্ক বসিয়ে তার ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে অর্থ আত্মসাৎকারী হিসেবে প্রচার চালানো হয়, যার ফলে তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন।

তিনি আরো জানান, ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে তিনি হারপিক খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি হলে অপার জিহ্বাই এন্ডোস্কোপিতে খাদ্যনালী ও পাকস্থলীতে ক্ষয়কারী পদার্থের কারণে গুরুতর আঘাতের প্রমাণ পাওয়া যায়।

বর্তমানে তিনি পরিবার ও শিশু সন্তানকে নিয়ে মামলার আসামি হিসেবে আত্মগোপনে থেকে ন্যায়বিচারের আশায় বিভিন্ন দফতরে ঘুরছেন বলে জানান।

এ ঘটনার এর আগে ২০২৩ সালের ২১ মার্চ মাহবুব রহমানসহ সিও এনজিও দ্বারা নির্যাতিত ঝিনাইদহ সদর শাখার সাবেক ম্যানেজার মাসুদা পারভীন, সদর শাখার সাবেক ম্যানেজার রাজশাহীর বাঘা উপজেলার লক্ষিনগর গ্রামের আজিজুল আলম, শৈলকূপার বাসিন্ধা হিসাব রক্ষক সাবিনা ইয়াসমিন ও যশোরের বিক্ররগাছা শাখার সাবেক ব্রাঞ্চ ম্যানেজার মেহেরপুরের আমদাহ গ্রামের আমিরুল ইসলামসহ তাদের পরিবারের সদস্যরা মানববন্ধন অংশে নেন। বিষয়টিতে ভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে সিও এনজিওর পক্ষ থেকে ঝিনাইদহের জোহান ড্রিম ভ্যালি পার্কে সংবাদ সম্মেলন করেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক শামছুল আলম।

সে সময় সময় সাংবাদিকদের কাছে একটি ভিডিও সরবরাহ করা হয়। ভিডিওতে মাহবুব রহমানকে দেখা বলা হয়, তাকে কোনো নির্যাতন করা হয়নি এবং তিনি সুস্থ অবস্থায় আত্মীয়ের বাড়িতে যাচ্ছেন। তবে মাহবুব রহমানের দাবি, ভিডিওটি রাত ৩টার দিকে ধারণ করা হয়েছিল এবং তার আগে তাকে দীর্ঘ সময় নির্যাতন ও ভয়ভীতি দেখানো হয়।

অভিযোগকারী দাবি করেন, সিও এনজিওর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের পর মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) প্রতিষ্ঠানটির ওপর বিশেষ অডিট ও তদন্ত পরিচালনা করে। ওই তদন্ত ও অডিট প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং তদন্তের ফলাফল সিও এনজিওর বিরুদ্ধে যায়।

কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত ও অডিট-সংক্রান্ত নথিতে সিও এনজিওর সুবিধা মাফিক পরিবর্তন এনে আদালতে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয় বলে তার অভিযোগ।

এছাড়া মামলার তদন্তেও প্রথমদিকে তার পক্ষে তদন্ত প্রতিবেদন এলেও পরে প্রভাব খাটিয়ে ভিন্ন প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সরজমিনে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে কথা বলে চাকরির নামে জামানত গ্রহণ, ফাঁকা ব্যাংক চেকে স্বাক্ষর নেওয়া এবং চাকরি ছাড়তে চাইলে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার মামলা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নির্ভরযোগ্য সূত্রের দেওয়া তথ্য মতে আরও জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের প্রবণতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ রয়েছে।

সিও এনজিওর অভ্যন্তরীণ একটি সূত্রের দাবি, দেশের ১০০ টি জেলায় প্রতিষ্ঠানটির শাখাগুলোকে কেন্দ্র করে কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রায় ৪৫ হাজার মামলার তথ্য রয়েছে।

একাধিক বর্তমান ও সাবেক কর্মীর অভিযোগ, এসব মামলার উল্লেখযোগ্য অংশ হয়রানিমূলক ও মিথ্যা। তাদের দাবি, চাকরি ছাড়তে চাইলে বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের প্রতিবাদ করলে অনেক ক্ষেত্রেই কর্মীদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ, চেক ডিজঅনারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক নারী কর্মকর্তা বলেন, এই প্রতিষ্ঠানে একবার চাকরিতে ঢুকলে সহজে বের হওয়া যায় না। ভালো চাকরি পেলেও অব্যাহতি চাইলে ফাঁকা চেকে বড় অঙ্কের মামলা করার ভয় দেখানো হয়। অনেকেই ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের কথা ভেবে সমঝোতা করতে বাধ্য হন।

এছাড়া সিও এনজিওর ঝিনাইদহে নির্মিত ১০ তলা বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কার্যালয় নির্মাণে ভবন নির্মাণবিধি অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ বিষয়ে ঝিনাইদহ পৌরসভার সাবেক প্রকৌশলী (অব.) কামাল উদ্দিন বলেন, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে সীমিত প্রক্রিয়ায় ভবনটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

এসব অভিযোগের বিষয়ে সিও এনজিওর পরিচালক শামছুল আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।