নিজস্ব প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬ , আজকের সময় : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

গণপূর্তে বৃক্ষপালনের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট, পিপিআর মানছেন না নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ!

গণপূর্তে বুয়েট ছাত্রলীগ নেতা নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ ঘুষ ছাড়া টেন্ডার ফাইল সই করেন না। নিজের খেয়াল খুশিমতো করেন সকল দাপ্তরিক কাজ। তাও আবার টাকা দিলে ফাইল পাস, আর না দিলে সর্বনাশ। এমন অভিযোগ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। তারা আক্ষেপ করে বলেন, এই নির্বাহী প্রকৌশলীর চোখে কোনো পর্দা নেই। নেই কোন লজ্জা এমনকি রাষ্ট্রের প্রতি ভালোবাসা। সরকার নগরকে সবুজায়ন এবং সুন্দর নগর জীবন গড়তে যে বাজেট দেয় তার বেশিরভাগ দিতে হয় ঘুষ। এর মধ্যে যে কাজ হয় তা নিম্নমানের। যার কারণে প্রতি বছর টেন্ডার করতে হয়। আবার তার মধ্যে আছে ইমারজেন্সি কাজ, যেমন বড় বৃষ্টিতে ক্ষতি, বিদেশ থেকে আগত ভিআইপি অতিথির আগমন উপলক্ষে সৌন্দর্য ও সবুজায়নে হাতে নেওয়া কাজ।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে থাকা আরবারিকালচার (আর্বার কালচার) বা বৃক্ষ পালন বিভাগ মূলতঃ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরসহ বঙ্গভবন সচিবালয় সংসদ ভবনসহ বিভিন্ন সরকারি অফিস ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনালোর ল্যান্ডস্কেপিং ফুলের বাগান তৈরীসহ চারপাশে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করে থাকে। এর প্রধান কাজগুলো হলো:

পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ: সরকারি বিভিন্ন স্থাপনা, যেমন জাতীয় সংসদ ভবন বা জাতীয় স্মৃতিসৌধের মতো স্থানে মানানসই বৃক্ষ, ফুল বাগান গুল্ম ও লতার চারা রোপণ ও পরিচর্যা করা।

সৌন্দর্য বর্ধন (সহযোগিতাসহ অবস্থানগুলোতে): বাগান তৈরি, ঘাস লাগানো এবং নান্দনিক ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনের মাধ্যমে এলাকার সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা।

গাছের স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা: গাছের রোগবালাই নির্ণয়, কীটনাশক প্রয়োগ এবং ক্ষতিগ্রস্ত গাছের ডালপালা ছাঁটাই করে দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

চারা উৎপাদন ও সরবরাহ: বিভিন্ন সরকারি নার্সারিতে চারা উৎপাদন এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে সবুজায়নে ভূমিকা রাখা। কিন্তু এই কাজে টেন্ডার বাণিজ্যে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ এটিএম (অথরাইজড অনলাইন গেটওয়ে) পদ্ধতির পরিবর্তে অভিনব কায়দায় এটিএম (অফলাইন ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে একের পর এক দরপত্র আহ্বান করে বিশাল ‘টেন্ডার বাণিজ্য’ ও কোটি টাকা লোপাট করার অভিযোগ উঠেছে ঢাকা আরবারিকালচার গণপূর্ত বিভাগের প্রধান বৃক্ষপালনবিদের দায়িত্বে নিয়োজিত নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে। তিনি নিয়ম নীতিকে তোয়াক্কা না করে গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রায় ৫১টি এটিএম দরপত্র আহ্বান করেছেন, যা নিয়ে খোদ গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে-বাইরে এবং ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগের অন্য কোনো সিভিল বিভাগ যেখানে ওটিএম পদ্ধতিতে এ ধরনের ঢালাও দরপত্র আহ্বান করেনি, সেখানে আরবারিকালচার বিভাগের এই কর্মকর্তার ওটিএম প্রীতি এবং রেট নিয়ে কারসাজির বিষয়টি বড় ধরনের প্রশাসনিক ও আর্থিক কেলেঙ্কারির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

দেড় মাসে ৫১টি এটিএম দরপত্রের ‘রেকর্ড’

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি, ২৭ জানুয়ারি এবং ৪ ফেব্রুয়ারি এই তিন দিনেই মূলত এটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আহ্বান করা উল্লেখযোগ্য ৫১টি দরপত্রের আইডি (রেফারেন্স নম্বর) নিচে তুলে ধরা হলো:

১৫ জানুয়ারি, ২৭ জানুয়ারি ও ০৪ ফেব্রুয়ারি (২০২৬) ১০৬২৬৮৮, ১০৬২৬৮১, ১০৬২৬৬২, ১০৬২৬৬৩, ১০৬২৬৫৪, ১০৬২৬৫৬, ১০৬৬১৪৩, ১০৬৬১৪৪, ১০৬৩৩৬৮, ১০৬২৭৬১, ১০৬২৭৬৭, ১০৬২৫৯৬, ১০৬২১৯৭, ১০৬২৩১৬, ১০৬২৩১৮, ১০৬২৬৯১, ১০৭১২৭২, ১০৭১৭৬৬, ১০৬৯১০০, ১০৬৯৯০১, ১০৬৮৬৮১, ১০৭০৭২৪, ১০৭১৭৭৬, ১০৭১৭৭৯, ১০৭১৭৮০, ১০৬৮৯৬২, ১০৬৮৮৭০, ১০৬২৬৪১, ১০৬৮৬৮৪, ১০৬৮৬৩১, ১০৭৫৯৪৪, ১০৫৭৫৮৬, ১০৬৮৮৫০, ১০৬৮৮৫৬, ১০৬৯৯২০, ১০৬২৬৭২, ১০৬৮৮৬০, ১০৬৪৬৮১, ১০৬৪৬৫১, ১০৬৭৮৫০

অভিযোগ রয়েছে, উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার নামে এটিএম করা হলেও পর্দার আড়ালে নির্দিষ্ট চক্রের সাথে সমঝোতা (রেট ফিক্সিং) করে এই বিপুল সংখ্যক টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে যার মূল লক্ষ্যই হলো কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা বা কমিশন হাতিয়ে নেওয়া।

১০ শতাংশ কমিশন ছাড়া সই হয় না ফাইল, প্রকল্প তদারকি, ফাইল প্রক্রিয়াকরণ এবং প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঠিকাদার ও বিভাগীয় সূত্রগুলোর দাবি বড় অংকের কমিশন বা ব্যক্তিগত আর্থিক সুবিধা ছাড়া এই দপ্তরে কোনো ফাইল নড়ে না। আরবারিকালচার গণপূর্ত বিভাগে প্রায় প্রতিটি ফাইলের বিপরীতে সাধারণত ১০ শতাংশ (১০%) পর্যন্ত কমিশন দাবি করা হয়। এই নির্ধারিত পার্সেন্টেজ বা ঘুষের টাকা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করেন না নির্বাহী প্রকৌশলী।

তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের (চওডি) আরবারিকালচার (বাগান ও বৃক্ষরোপণ) বা অন্য কোনো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রমাণিত হলে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি এবং বিশেষ দুর্নীতিবিরোধী আইন অনুযায়ী বিচার করা হয়।

মূল আইনি কাঠামো:

দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪: দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সরকারি কর্মচারীদের যে কোনো ধরনের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করে এবং তাদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করতে পারে।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০: সরকারি কর্মচারী কর্তৃক অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ (ধারা ৪০৯), প্রতারণা বা সরকারি অর্থ আত্মসাতের মতো অপরাধগুলোর জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭: অপরাধমূলক অনাচার বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে সরকারি সম্পদের ক্ষতিসাধন করলে এই আইনের ৫/২ ধারায় সর্বোচ্চ ৭ বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।

অতিরিক্ত প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা:

সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮: দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ মিললে বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে সাময়িক বরখাস্ত, অবনমিত, বেতন কাটা বা চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর বা বরখাস্তের মতো ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

ঠিকাদারদের শাস্তি: আরবারিকালচার বা অন্য কোনো কাজের ঠিকাদাররা যদি কাজে ফাঁকি, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার বা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে যোগসাজশে দুর্নীতি করেন, তবে তাদের কারাদণ্ড, কালো তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করা এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করার বিধান রয়েছে।

সরকারি বড় বড় প্রকল্প ও দেশের উন্নয়নে জনগণের ট্যাক্সের হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ থাকে, আর সেই টাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের পকেটে গোছাতে নীতিহীন লুটপাটে করছে, প্রকল্পের ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি কাজের গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা ব্যক্তিগত লাভের জন্য জনসম্পদ বা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারেন না। প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো, সরকারি ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে হার মানিয়েছে।

এই সব অনিয়ম দুর্নীতি ও টেন্ডার বাণিজ্যের বিষয় জানতে গণপূর্ত আরবারিকালচারের নির্বাহী আবুল কালাম আজাদ এর সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।