নিজস্ব প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬ , আজকের সময় : বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

বদলি আদেশ গায়েব করে এক যুগ ধরে সিএফ কার্যালয়ে হিসাবরক্ষক ইউছুপ: ৯ ডিভিশন থেকে মাসোহারা ও কোটি টাকার বদলি বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য

চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষকের (সিএফ) কার্যালয়ে কর্মরত হিসাবরক্ষক (ভারপ্রাপ্ত প্রধান সহকারী হিসেবে দায়িত্বরত) মোহাম্মদ ইউছুপ নিজের বদলির সরকারি আদেশ অত্যন্ত সুকৌশলে গোপন ও গায়েব করে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে একই কার্যালয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছেন এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধীনে থাকা সব কটি ডিভিশন থেকে নিচ্ছেন মোটা অংকের মাসোহারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক বন সংরক্ষক বিপুল কৃষ্ণ দাস ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসের দিকে এক অফিস আদেশ মূলে মোহাম্মদ ইউছুপকে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে বদলি করেছিলেন, কিন্তু সেই বদলির আদেশ জারির পর প্রায় আড়াই বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি বহাল তবিয়তে সিএফ কার্যালয়েই থেকে গেছেন।

২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন সিএফ বিপুল কৃষ্ণ দাসকে অন্যত্র বদলি করা হলে ইউছুপ যেন হাতে আলাদিনের চেরাগ পেয়ে যান এবং নিজের বদলি আদেশটি অত্যন্ত সুকৌশলে নথিপত্র থেকে সরিয়ে ফেলেন, এমনকি চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের সাবেক ডিএফও আব্দুল্লাহ আল মামুনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ওই দক্ষিণ বন বিভাগের দাপ্তরিক ইমেইল থেকেও আদেশের কপিটি সম্পূর্ণ মুছে ফেলা হয়, যা ডিএফও আব্দুল্লাহ আল মামুন স্বয়ং সহযোগিতা করে করিয়েছেন বলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে কর্মরত এক অফিস সহকারী নিশ্চিত করেছেন।

মোহাম্মদ ইউছুপের বদলি আদেশটি ধামাচাপা দেওয়ার পর ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে দুজন বন সংরক্ষকের কর্মকাল অতিবাহিত হলেও বন অধিদপ্তরের বদলি আদেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এবং আদেশ পুরোপুরি গায়েব করে দিয়ে তিনি বহাল তবিয়তে একই চেয়ার আঁকড়ে আছেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলের অধীনে থাকা ৯টি ডিভিশন এবং ১টি বোটানিক্যাল গার্ডেন থেকে প্রতি মাসে ইউছুপকে মোটা অংকের মাসোহারা দিতে হয়, যার কারণে সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, প্রতিটি ডিভিশনের অধীনে থাকা শহর রেঞ্জ বা সদর রেঞ্জ এবং প্রতিটি চেক স্টেশন থেকে তাকে প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ফিক্সড মাসোহারা দিতে হয়, এর বাইরেও বান্দরবান, পাল্পউড প্ল্যান্টেশন ও লামা বন বিভাগের ইস্যুকৃত জোত পারমিট থেকে ঘনফুট প্রতি এক টাকা হারে সরাসরি ইউছুপের পকেটে যায়।

এখানেই মোহাম্মদ ইউছুপের দুর্নীতির শেষ নয়, তার টেবিলে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দিলেই মিলছে ‘প্রাইজ ডিভিশন’ বা লোভনীয় কর্মস্থলে কর্মরত থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত কর্মকাল কমানো বা বাড়ানোর বিশেষ অবৈধ সুবিধা। বন অধিদপ্তরের অফিশিয়াল বদলি নীতিমালা অনুযায়ী প্রত্যেক ডিভিশনে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী সর্বোচ্চ ৩ বছরের বেশি থাকতে পারবেন না, কিন্তু ইউছুপ এই জাতীয় নীতিমালাকে পুরোপুরি আড়াল ও অকার্যকর করে দিয়ে প্রাইজ পোস্টিংয়ে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ ও মাসোহারা উৎকচের চুক্তি করেন, যার বিনিময়ে ৫ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত একই লোভনীয় স্থানে থাকার অবৈধ বন্দোবস্ত করে দেন।

এর ফলে বিপরীত দিকে দুর্গ বা খারাপ ডিভিশনে কর্মরত সাধারণ কর্মচারীদের ৮ বছর, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ বছর অতিবাহিত হয়ে গেলেও বছরের পর বছর চরম কষ্টকর ডিভিশনে পড়ে থাকতে হচ্ছে। তিনি বন সংরক্ষকের কার্যালয়ে পুরো বদলি বাণিজ্য একা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং জানা গেছে অন্যান্য অঞ্চলে একাধিক কর্মচারীদের দেখভালের জন্য একাধিক অফিস সহকারী থাকলেও চট্টগ্রাম অঞ্চলে ইউছুপ নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে এর ব্যতিক্রম ঘটিয়ে পুরো সিন্ডিকেট একাই চালাচ্ছেন, যার কারণে টাকা দিলেই মিলছে নিজের সুবিধাজনক ডিভিশনে কর্মকাল কম-বেশি করে প্রাইজ পোস্টিং আর টাকা না দিলে বদলি না হয়ে বছরের পর বছর পড়ে থাকতে হচ্ছে দুর্গম ও কষ্টকর এলাকায়। এমনকি বর্তমান চট্টগ্রাম অঞ্চলের সিএফ মিহির কুমার দো-এর আমলেও দেদারসে চলছে এই বিশাল বদলি বাণিজ্য ও সিন্ডিকেট, যার মূল নেপথ্য কারিগর ও মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করছেন এই ইউছুপ এবং বদলির যাবতীয় টাকার লেনদেন ও চুক্তি সরাসরি ইউছুপের মাধ্যমেই সম্পন্ন হচ্ছে বলে কক্সবাজার ও উপকূলীয় বন বিভাগে কর্মরত একাধিক ভুক্তভোগী কর্মচারী আক্ষেপ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে মোহাম্মদ ইউছুপের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিনিধিকে জানান, বদলি হওয়ার বিষয়টি সত্য তবে তা আড়াল করা হয়নি, অফিসে খোঁজাখুঁজি করলে আদেশটি পাওয়া যেতে পারে।

একই সাথে তিনি আরও জানান, সাবেক বন সংরক্ষক ড. মোল্যা রেজাউল করিমকে নিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিভিন্ন বিতর্কিত বিষয় আড়াল করতে তিনি নিজের স্বার্থেই তাকে রেখে দিয়েছিলেন এবং বর্তমান বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো-ও একই কারণে তাকে এখানে বহাল রেখেছেন, তবে কর্তৃপক্ষ তাকে ছেড়ে দিলে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে যোগদান করবেন। এদিকে ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, শুধু বদলিকৃত কর্মস্থলে তাকে যোগদানে বাধ্য করলেই হবে না; দীর্ঘ এক যুগ ধরে দুর্নীতির আড়ালে অবৈধভাবে কামানো কোটি কোটি টাকার সম্পদের সঠিক হিসাব দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃপক্ষকে খতিয়ে দেখতে হবে এবং এই শীর্ষ দুর্নীতিবাজকে অনতিবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে