নিজস্ব প্রতিবেদক: , আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬ , আজকের সময় : বুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬

তিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দিনভর ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ: আহত অর্ধশতাধিক

রাজধানীর কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) থেকে শুরু হওয়া উত্তেজনা পরে ঢাকা কলেজ, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষে তিন সংগঠনের নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী ও কয়েকজন সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।

সংঘর্ষের ঘটনায় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পুরান ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের সূত্রপাত

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যানের উপস্থিতিতে একটি ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী ও আলোচনা অনুষ্ঠান চলছিল। এ সময় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জকসু), ইনকিলাব মঞ্চ ও কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর, কেরানীগঞ্জে অস্থায়ী আবাসন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন, মেডিকেল সেন্টারের উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশের চেষ্টা করেন।

এ সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও মারামারির ঘটনা ঘটে।

সংঘর্ষে জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জিএস ও জবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ, ছাত্রশক্তির সভাপতি শাহীন মিয়াসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। কয়েকজন সাংবাদিকও আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
জকসুর জিএস আব্দুল আলিম আরিফ অভিযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি শান্তিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করতে গেলে তাদের বাধা দেওয়া হয়। তার দাবি, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারেও ভাঙচুর করা হয়েছে।

তিনি ঘটনার তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ দাবি করেন।

অন্যদিকে জবি ছাত্রদলের সদস্য সচিব শামসুল আরেফিন অভিযোগ করেন, ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করেছে। তার দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীরাই এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিহত করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক নাসির উদ্দীন বলেন, অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠান চলার সময় বাইরে একটি পক্ষ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে।

ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ফের সংঘর্ষ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষে আহতদের কয়েকজনকে চিকিৎসার জন্য পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুপুরের দিকে সেখানে ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা জড়ো হলে হাসপাতালের বাইরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও অবস্থান নেন।

একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে আবারও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। হাসপাতালের ভেতরে আশ্রয় নেন কয়েকজন শিবির নেতাকর্মী। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি কয়েকজনের হাতে দেশীয় অস্ত্র দেখা যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।

হাসপাতালের রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, বিকেলের দিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিবির ও ছাত্রশক্তির কয়েকজন নেতাকর্মীর ওপর আবার হামলার ঘটনা ঘটে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঢাকা কলেজে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার পর ঢাকা কলেজেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

মঙ্গলবার দুপুরে কলেজের গ্যালারি-২ এলাকায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল ছাত্রশিবির।

শিবিরের অভিযোগ, অনুষ্ঠানস্থলের প্রস্তুতির সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা এসে হামলা চালায়। এতে অন্তত ২০ থেকে ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে সংগঠনটির নেতারা দাবি করেন।

অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, শিবিরের নেতাকর্মীরা বহিরাগতদের নিয়ে ক্যাম্পাসে এসে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং তাদের কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে।

ঘটনার পর উভয় পক্ষের নেতাকর্মীরা কলেজ এলাকায় অবস্থান নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

আলিয়া মাদ্রাসায় সংঘর্ষ
পুরান ঢাকার সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়াতেও বিকেলে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিকেল সোয়া ৫টার দিকে মাদ্রাসার সামনে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে এবং কয়েকজন আহত হন।

শিবিরের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়, হলের বিভিন্ন কক্ষ দখল ও সাংগঠনিক বিরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়।

পুলিশের বক্তব্য
সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিউর রহমান জানান, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষের পর আহতরা হাসপাতালে গেলে সেখানে আবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।

সার্বিক পরিস্থিতি
একই দিনে রাজধানীর একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় পুরান ঢাকার শিক্ষাঙ্গনগুলোতে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বিরোধ, শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া এবং সাংগঠনিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে এসব সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারণে তদন্তের দাবি জানিয়েছে উভয় পক্ষ।