নিজস্ব প্রতিবেদক: , আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬ , আজকের সময় : মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

জুলাইকে ভুলিয়ে দেয়ার অপচেষ্টা প্রতিরোধ করা হবে: জামায়াত আমীর

জুলাই বিপ্লবের ইতিহাস বিকৃত বা জনগণকে তা ভুলিয়ে দেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ অপচেষ্টা তছনছ করে দেয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান।

মঙ্গলবার (০৪ আগস্ট) সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে জুলাই আন্দোলন শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন জামায়াত আমীর।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার কোনো উল্টো সংগ্রাম যদি শুরু হয়ে থাকে, তাহলে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলছি, দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তা প্রতিহত করব।

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক দল মাস্টারমাইন্ড ছিল না। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, তরুণ, শিশু ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই আন্দোলন সফল হয়েছে। অথচ এখন আন্দোলনে অংশ না নেয়া ব্যক্তিরাও নিজেদের মাস্টারমাইন্ড দাবি করছেন। ০৫ আগস্ট যারা শেখ হাসিনার বিদায়কে মিরাকল বলেছিলেন, তারাই এখন অভ্যুত্থানের ভাগ-বাটোয়ারায় ব্যস্ত।

জামায়াত আমির বলেন, “জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার কোনো উল্টো সংগ্রাম যদি শুরু হয়ে থাকে, তাহলে মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে বলছি, দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে আমরা তা প্রতিহত করব।”

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের কোনো একক ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিল না। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, তরুণ, শিশু ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই আন্দোলন সফল হয়েছে। তাই এই আন্দোলনের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে কার কী অবদান ছিল, তা যেন আড়াল না হয় এবং একটি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভুল ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়।

তিনি বলেন, “আপনার-আমার পছন্দ হোক বা না হোক, যার যেখানে যে অবদান, তা ইতিহাসে স্থান পেতে হবে। একটি ক্রেডিবল ইতিহাস তৈরি হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম প্রকৃত ঘটনাগুলো জানতে পারে।”

জুলাই আন্দোলনে নিহত, আহত ও পঙ্গুত্ববরণকারী ব্যক্তিদের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমির বলেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব এখনো শেষ হয়নি। তিনি জানান, আন্দোলনের সময় তার দলের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং চিকিৎসায় কোনো অবহেলা না করার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ করেছেন।

সম্প্রতি থাইল্যান্ডের ব্যাংককে চিকিৎসাধীন কয়েকজন আহতকে দেখে আসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, অনেকেই এমনভাবে আহত হয়েছেন যে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তারা আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। “কেউ কেউ সারা শরীর অবশ হয়ে পড়ে আছেন। তাদের কথা রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। যাদের রক্ত, সাহসিকতা ও আত্মত্যাগে আজকের পরিবর্তন এসেছে, তাদের ভুলে যাওয়া চরম বিশ্বাসঘাতকতা হবে।”

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের গায়ে হাত দেবেন না। যাদের কারণে আজ আপনি সরকার, তাদের চোখ কেড়ে নেবেন না, হাত-পা ভাঙবেন না, এক ফোঁটা রক্তও ঝরাবেন না। যদি তা হয়, সেটি হবে চরম নিমকহারামি।”

জুলাই বিপ্লবের সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি তিনি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার নির্ভুল তালিকা প্রস্তুত হয়নি। একই ভুল যেন ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ক্ষেত্রে না হয়। শহীদ, আহত ও অংশগ্রহণকারীদের একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, “এটি শুধু কোনো বেসরকারি উদ্যোগের বিষয় নয়, সরকারেরও দায়িত্ব সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ করা। ইতিহাস উঠে আসুক, শহীদ পরিবারের যথাযথ সম্মান নিশ্চিত হোক।”

ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যে ধীরে ধীরে পরিবর্তন এসেছে এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর পর সেই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়েছে। তার দাবি, আগে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি এখন ভুলে যাওয়া হচ্ছে এবং তার বিপরীতে নতুন বয়ান তৈরি করা হচ্ছে।

জুলাই ঘোষণাপত্র ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রসঙ্গেও তিনি সরকারের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ৫ আগস্টের মধ্যে জুলাই ঘোষণাপত্র প্রকাশ এবং জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু ৪ আগস্ট পর্যন্ত সে ধরনের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, “এগুলো তাহলে কি জুলাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার একটি নিরন্তর উল্টো সংগ্রাম? যদি সেরকম কোনো চেষ্টা হয়ে থাকে, আমরা দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করব।”

গণতন্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণের রায়ই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ। জনগণের রায়ের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই এবং জনগণের অধিকার ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা যাবে না।

তার ভাষায়, “জনগণ যে রায় দিয়েছে, সেটাই মানতে হবে। আমাদের আলাদা কোনো রায় নেই। আমরা জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাই না।”

তিনি আরও অভিযোগ করেন, গুম, খুন, নির্যাতন, পঙ্গুত্ব ও মিথ্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়া বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে। এসব ঘটনার বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে প্রয়োজন হলে জামায়াতে ইসলামী যে কোনো সময় ঐক্যবদ্ধ হতে প্রস্তুত। তবে জনগণের মৌলিক অধিকার বিসর্জন দিয়ে কোনো আপস করা হবে না এবং কোনো ধরনের আধিপত্যবাদের কাছে দল মাথা নত করবে না।

বক্তব্যের শেষদিকে তিনি বলেন, “দেশ ও জনগণের প্রয়োজন হলে আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে পাশে থাকব। জেল, আয়নাঘর কিংবা মৃত্যুর ভয় আমাদের দমাতে পারবে না। প্রয়োজনে জেলে যাব, আয়নাঘরে যাব, কিংবা কবরে যাব—তবু দেশের স্বার্থে সংগ্রাম থেকে সরে আসব না।”