নিজস্ব প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬ , আজকের সময় : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬

শাস্তির বদলে সাভারের ওসি: ক্ষোভে ফুঁসছে মেহেরপুরবাসী

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তক্ষয়ী দিনগুলোতে ছাত্র-জনতার ওপর চরম নির্যাতন, প্রকাশ্যে গুলি বর্ষণ এবং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের স্ত্রীর ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে কাজ করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যাঁর বিরুদ্ধে—সেই বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তা সাইফুল আলম এখন ঢাকা জেলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাভার মডেল থানার ওসি।

​মেহেরপুরে আন্দোলনকারীদের ওপর হত্যাচেষ্টা, বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন এবং শতকোটি টাকার অনলাইন জুয়া বাণিজ্যের মূল কারিগর হয়েও এই কর্মকর্তা কীভাবে বহাল তবিয়তে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ থানার দায়িত্ব পাচ্ছেন, তা নিয়ে ক্ষোভে ফুসছে সুশীল সমাজ, স্থানীয় বিএনপি-জামায়াত এবং সাধারণ ছাত্র-জনতা।

​মেহেরপুর থেকে রাতের আঁধারে চম্পট :

​অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২২ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত মেহেরপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দায়িত্ব পালন করেন সাইফুল আলম। ওই সময়ে জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, গুলি বর্ষণ এবং স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে বিপুল অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। ​এ সংক্রান্ত বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ অধিদপ্তরে দুটি লিখিত অভিযোগও জমা পড়েছে (স্মারক নং: ৪১৯, তারিখ: ৪ আগস্ট ২০২৬)।

​গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর মেহেরপুরের মুজিবনগর থানা থেকে গভীর রাতে আত্মগোপনে চলে যান সাইফুল আলম। এর আগে ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের সময় তিনি শরীয়তপুর জেলা ডিবি এবং তার পূর্বে কিশোরগঞ্জ ডিবিতে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া আওয়ামী শাসন আমলে বাগেরহাটের মোল্লারহাটে শ্বশুরবাড়ির সুবাদে শেখ হেলালের রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে মেহেরপুর জেলা ডিবিতে তিনি নিজস্ব ‘রাজত্ব’ কায়েম করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

​সাবেক মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের স্ত্রীর ‘ক্যাশিয়ার’:

​মেহেরপুরের সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেন ও তাঁর পরিবারের গড়ে তোলা দুর্নীতি সাম্রাজ্যের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন পুলিশ পরিদর্শক সাইফুল আলম। স্থানীয়দের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন মন্ত্রীর স্ত্রী মোনালিসা ইসলামের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে। ​অনলাইন জুয়া বাণিজ্য: মন্ত্রীর স্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকা মেহেরপুরের শতকোটি টাকার অনলাইন জুয়া ব্যবসার মূল তদারক ও অর্থ সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন সাইফুল আলম। এই খাত থেকে প্রতি মাসে আনুমানিক ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা কালেকশন করা হতো।

​হয়রানি ও চাঁদাবাজি: সাবেক মেহেরপুর পৌরসভার মেয়র ও জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মাহফুজুর রহমান রিটনের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ডিবি পুলিশ মেহেরপুর থেকে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। মন্ত্রীর আত্মীয়স্বজনদের অবৈধ সিন্ডিকেটে কেউ বাধা দিলে ওসি সাইফুল আলমকে দিয়ে তাঁকে গ্রেফতার ও হয়রানি করা হতো।

​অভিযোগের বিষয়ে তৎকালীন ডিবি ওসি সাইফুল আলম মেহেরপুরে জুয়ার প্রাদুর্ভাবের কথা স্বীকার করলেও নিজের সম্পৃক্ততা এড়িয়ে যান। তবে গণমাধ্যমের কাছে তিনি দাবি করেন: ​”মেহেরপুরে প্রতি মাসে হাজার কোটি টাকার অনলাইন জুয়ার ব্যবসা হয়… তবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের চাপে পুলিশ তা পুরোপুরি নির্মূল করতে পারেনি।”

​মেহেরপুর থেকে সাভার: ক্ষমতার পুনর্বাসন?

​৫ আগস্টের পর সারা দেশে পুলিশি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং বিতর্কিত পুলিশ সদস্যরা আত্মগোপনে গেলেও সাইফুল আলমের ক্ষেত্রে দৃশ্যপট একেবারেই ভিন্ন। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন ও পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আইজিপি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে আইনের আওতায় আনা হয়নি।

​উল্টো মেহেরপুর থেকে সরিয়ে প্রথমে তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় পদায়ন করা হয়। পরবর্তীতে গত ৩১ জুলাই ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শামীমা আক্তার স্বাক্ষরিত এক আদেশের মাধ্যমে তাঁকে সাভার মডেল থানার নতুন ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

​ক্ষোভে ফুসছে মেহেরপুরের রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন ​জুলাই আন্দোলনে বিতর্কিত ভূমিকা রাখা সাইফুল আলমকে সাভারের মতো স্পর্শকাতর থানায় পদায়ন করায় তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান এবং জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হুসাইন।

​মেহেরপুর জেলা জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হুসাইন বলেন:​”জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর নির্যাতনকারী ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত সাইফুল আলমের স্থান হওয়ার কথা ছিল কারাগারে। অথচ তাঁকে শাস্তি না দিয়ে সাভারের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানায় পুনর্বাসিত করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের সাথে চরম প্রতারণা।”

​জুলাই আন্দোলনের রক্তের দাগ না শুকাতেই ফরহাদ হোসেনের ঘনিষ্ঠ ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত সাইফুল আলমের এই পদায়ন ঢাকা অঞ্চলেই জনমনে নানা প্রশ্ন ও গভীর অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মূল চেতনা বাস্তবায়নে এমন বিতর্কিত ওসিকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করে আইনের মুখোমুখি করার জোর দাবি জানিয়েছে স্থানীয় ছাত্র-জনতা।