বিশেষ প্রতিবেদক: , আপলোডের সময় : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬ , আজকের সময় : শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬

পূষ্পধারা হাউজিং এর নতুন জালিয়াতির ফাঁদ, পা দিলেই সর্বনাশ

জমি বিক্রির প্রচারণায় কথিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ব্যবহার করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার অভিযোগ উঠেছে রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান পুষ্পধারা প্রপার্টিজের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি পুষ্পধারা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলে সম্ভাব্য ক্রেতাদের ভবিষ্যতে জমির মূল্য কয়েকগুণ বাড়বে—এমন আশ্বাস দিয়ে বিনিয়োগে উৎসাহিত করছে

অনুসন্ধানে দেখা যায়, পুষ্পধারা তাদের প্রচারণায় দাবি করছে, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর আন্তর্জাতিক মানের একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে প্রচারণায় বলা হচ্ছে, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে জমি কিনলে ভবিষ্যতে তা পানির দামে হীরা কেনার মতো লাভজনক বিনিয়োগ হবে

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়টি সরকারের অনুমোদনপ্রাপ্ত নয়। সরকারি গেজেট, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন বা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) স্বীকৃতির তথ্য ওই বিষয়ে পাওয়া যায়নি

আরও দেখা যায়, পুষ্পধারার ওয়েবসাইটে সহযোগী প্রতিষ্ঠানের তালিকায় ‘পুষ্পধারা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি’ নামটি উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটি আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসের কার্যক্রম নেই, নেই সরকারি অনুমোদনের তথ্যও

এদিকে, জমি বিক্রির নামে প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে পুষ্পধারা প্রপার্টিজের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আশ্বাসকে বিপণন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে ক্রেতাদের কাছ থেকে জমি বিক্রির চেষ্টা চলছে

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পতিত আওয়ামী লীগের মন্ত্রী কিংবা এমপির কাছ থেকে টাকা নিয়ে পুষ্পধারা কথিত এই বিশ্ববিদ্যালয় করবে। এই কারণে পুষ্পধারা কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুর্নীতিগ্রস্ত সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের সভাপতি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের সঙ্গে যোগাযোগ করছে

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ১০০ কোটি টাকা ফান্ড সংগ্রহের চেষ্টা করছেন পুষ্পধারার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলীনূর ইসলাম। আর আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান। তাদের কৌশল এখানেই শেষ নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারার নিয়োগ দেওয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে পুষ্পধারা—এমনও অভিযোগ রয়েছে

পুষ্পধারার নানারকম প্রতারণায় সহযোগিতা করে যাচ্ছেন পরিচালক ফয়সাল আহমেদ খান, দুর্নীতির দায়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চাকরিচ্যুত মো. মঈন খান, মো. হাসিবুল হক ওরফে ডেসটিনি মামুন, মো. জুলফিকার আলী, এনামুল হক, মো. আতিকুর রহমান, মো. মমিনুল ইসলাম মিয়াজী, সৈয়দ মাসুদুর রহমান, তুষার দেওয়ান, মোহাম্মদ আলী রেজা। এরা কোম্পানির পরিচালক হিসেবে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন

এমনকি কোনো সাংবাদিক তাদের বিরুদ্ধে নিউজ করলে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। গুম, খুনের হুমকিও পাচ্ছেন সাংবাদিকরা, দেওয়া হচ্ছে মামলার হুমকি

৫ আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পুষ্পধারায় আওয়ামী লীগের দোসররা এখন বিএনপির লেবাস ধারণ করেছেন। পুষ্পধারার এই প্রতারণায় সহযোগিতা করছেন ফুটপাতের চাঁদাবাজ পাতি নেতা খায়রুজ্জামান রাজ ওরফে ‘হিযড়া রাজ’। এই ‘হিযড়া রাজ’ ঢাকায় সমকামী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমকামী নেটওয়ার্কের সক্রিয় এই সদস্য নিজেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠ লোক বলে পরিচয় দেন। এই হিযড়া রাজ ডেসটিনি মামুনের লাঠিয়াল হিসেবে কাজ করছেন

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কেউ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ভাঙিয়ে প্রতারণা করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আইন অনুযায়ী সরকারের অনুমোদন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী গেজেট প্রকাশ বাধ্যতামূলক। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ে প্রচারণা চালানো আইনসম্মত নয়

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী সরকার কর্তৃক অনুমোদিত এবং আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত না হলে কোনো প্রতিষ্ঠান নিজেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচয় দিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের অনুমোদন ও সরকারি গেজেট প্রকাশ অপরিহার্য

আইনে আরও বলা হয়েছে, কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম এমন হতে পারবে না, যা বিদ্যমান কোনো সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে বিভ্রান্তিকর সাদৃশ্য সৃষ্টি করে। আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সরকার, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। অনুমোদন ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রচারণা, শিক্ষার্থী ভর্তি বা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা আইনবিরোধী

অনুসন্ধানে পুষ্পধারা প্রপার্টিজের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাব্য প্রশাসনিক পদ—যেমন উপাচার্য (ভিসি), উপ-উপাচার্য (প্রো-ভিসি) ও ট্রেজারার নিয়োগের আশ্বাস দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য নথি এই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত পাওয়া যায়নি

অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলীনূর ইসলামের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথানিয়মে প্রকাশ করা হবে

এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত পুষ্পধারার চেয়ারম্যান মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানের একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি