নিজস্ব প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬ , আজকের সময় : রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬

১৫বছরের চাকরি জীবনে ৯০ লাখ টাকা বেতন পেয়ে মিঠাপুকুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মনিরুজ্জামান গড়েছেন শতকোটি টাকার সম্পদ

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরে চাকরি করে স্ত্রী ও নিজের নামে ঢাকা, রংপুর ও কুড়িগ্রামে গড়ে তুলেছেন একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট, গাড়িসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ডাচ-বাংলা ব্যাংকে মিলেছে কোটি কোটি টাকা লেনদেন। তিনি মনিরুজ্জামান সরকার, রংপুর মিঠাপুকুর উপজেলায় অষ্টম বছরের মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও)।

২০১১ সালের ৭ জুলাই ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) হিসেবে প্রথম যোগদান করেন মনিরুজ্জামান সরকার। যোগদানের ছয় মাস পর স্থায়ীভাবে পিআইও পদে নিয়োগ পেয়ে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় বদলি হন। কাহারোলে দায়িত্ব পালনের সময় থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে জড়িয়ে পড়েন। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মাত্র ১৫ বছরের চাকরি জীবনে তার বৈধ আয় প্রায় ৯০ লাখ টাকা হলেও, অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।

মনিরুজ্জামান সরকারের যত সম্পদ

এছাড়া কুড়িগ্রাম শাপলা চত্বরে বরকত টওয়ারের নিচ তলায় মনিরুজ্জামান কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিশাল ফার্মেসি প্রতিষ্ঠা করেছেন। এর বাইরেও কিনেছেন ৬টি মাইক্রোবাস যেগুলো বিভিন্ন রেন্ট-এ-কারের মাধ্যমে ভাড়া চলছে। নিজে ব্যবহার করেন অর্ধকোটি টাকার গাড়ি।

সূত্র মতে, সম্প্রতি তেলের পাম্প ব্যবসায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছেন মনিরুজ্জামান। এছাড়া স্ত্রী আফরোজা নাহারের বড় ভাই রায়হানের নামে বাড়ি করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বাইরেও নামে, বেনামে ঢাকা,রংপুর ও কুড়িগ্রামে আরও নানা দিক সম্পদে ছেয়ে গেছে। এ বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মনিরুজ্জামান সরকার কাহারোল উপজেলায় যোগদানের পর বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ ভাগাভাগি নিয়ে সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপালের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। পরবর্তীতে ওই এমপি নিজের সুপারিশের মাধ্যমে তাকে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায় বদলি করান।

নবাবগঞ্জ উপজেলায় ২০১৪-১৫ সালে ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ১০ কোটি টাকার টিআর ও কাবিখার বিশেষ প্রকল্প নিয়ে আসেন। যার অধিকাংশ অর্থই তিনি আত্মসাৎ করেন। তবে বিষয়টি জানাজানি হলে প্রকল্পের কিছু কাজ তিনি সম্পন্ন করেন। সেই সময়ে এসব দুর্নীতির বিষয়ে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় বগুড়ার দুদক-এর এক কর্মকর্তাকে। দুদকের সেই কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে বিষয়টি ধামাচাপা দেন মনিরুজ্জামান।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার সুপারিশে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে প্রবেশ করেন মনিরুজ্জামান। এরপর রাজনৈতিক বিভিন্ন শক্তির সাথে সখ্য গড়ে ওঠে তার। ডিজিটাল মাধ্যমে পিআইওদের বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন এবং সারা দেশের পিআইওদের বদলি বাণিজ্য করে ওই সময়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন মনিরুজ্জামান সরকার।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শুকুরেরহাট ডিগ্রী কলেজের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল টিআরের ৩ লাখ টাকা। প্রকল্পের চেয়ারম্যান ছিলেন সহকারী অধ্যাপক শওকত হোসেন। তাকে দুই দফায় ৩ লাখ টাকার কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল, বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন শওকত হোসেন।

শুকুরেরহাট ইসলামিয়া আলিম মাদরাসায় উন্নয়নের জন্য টিআরের ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এ প্রকল্পেও দুই দফায় ১ লাখ ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। সেটাও স্থানীয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেছিলেন ওই প্রকল্পের চেয়ারম্যান সহকারী শিক্ষক আবদুল কাইয়ুম।

ঠাকুরবাড়ি বাজার হতে পূর্ব জামে মসজিদের মাঠে মাটি ভরাটের জন্য ৪ লাখ ৬২ হাজার টাকা, দুর্গাপুর কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে মাটি ভরাট ও উন্নয়নের জন্য কবিখা ও কাবিখার তিন দফায় ২০ টন চাল ও ২ লাখ টাকা, বড়বালা ইউনিয়নের তাম্বুলপুর বাড়ি হতে ধানের ক্ষেত বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য ৩ লাখ ৫ হাজার, রানীপুকুরের বুড়ির দীঘিপাড় বাড়ি হতে মনজুর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা ভরাটের জন্য ৩ লাখ, ইমাদপুর ইউনিয়নে মসজিদপাড়া পাকা রাস্তা হতে চন্ডীপুরগামী রাস্তা সংস্কারের জন্য ৩ লাখ, বড়বালা ইউনিয়নের সুবাসের বাড়ি হতে মজিদপাড়া ঘাট পর্যন্ত রাস্তা সংস্কারের জন্য ৩ লাখ, উপজেলা পরিষদ রাস্তা নির্মাণের জন্য ৪ লাখ টাকা এবং উপজেলা পরিষদ মাঠে মাটি ভরাটের জন্য ১০ টন গম বরাদ্দসহ আরও ৩টি প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে ভুয়া বিল ভাউচার করে অর্থ হরিলুট করেছিলেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মনিরুজ্জামান তৎকালীন নিজ অফিস স্ক্যানিং করা বিলে সংকেত এমপির ফান্ড থেকে টিআর ও কাবিখার ১৪ লাখ টাকা এবং কাবিখার ১০ টন গম বরাদ্দ নেন। যার কাজ দেখানো হয়েছে উপজেলা পরিষদের সংলগ্ন রাস্তা নির্মাণ ৪ লাখ টাকা, ইমাদপুর ইউনিয়নের মসজিদপাড়া পাকা রাস্তা হতে চণ্ডীপুরগামী রাস্তা সংস্কার ৪ লাখ, বড়বালা ইউনিয়নের সুবাসের বাড়ি হতে মজিদপাড়া ঘাট পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার ৩ লাখ এবং উপজেলা পরিষদ মাঠে মাটি ভরাট ৩-১০ টন গম।

এসব প্রকল্পের চেয়ারম্যান করা হয় সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান এবং ইউপি সদস্যদের। তবে এসব কাজ না করে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মাধ্যমে প্রকল্পের টাকা তুলে নিয়েছিলেন পিআইও। যদিও জালিয়াতিগুলো নাম মাত্র ছিল, তারা প্রকল্পের টাকা ব্যাংক থেকে তোলার বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

২০২২-২৩ অর্থবছরে পিআইওর কার্যালয়ে ই-টেন্ডারের জন্য বরাদ্দ হয়েছিল ৪ লাখ ২২ হাজার এবং গেল অর্থবছরে একই কাজের জন্য তিন দফায় বরাদ্দ বাড়িয়ে হয় ৭ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। তৎকালীন সময়ে অফিসের একজন স্টাফ (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানিয়েছিলেন, অফিসে পিসিওডি তিন দফায় প্রায় ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়েও কোনো কাজই করেননি। ওই স্টাফ আরও জানিয়েছিলেন, পিআইও টিআর বরাদ্দ থেকে দুই দফায় কম্পিউটারের সেট কেনার জন্য ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা বিল বরাদ্দ নিয়ে আত্মসাৎ করেছিলেন মনিরুজ্জামান। তবে এর এক মাস আগে মন্ত্রণালয়ের থেকে কম্পিউটার সেট কেনার জন্য ২ লাখ টাকা বরাদ্দ নিয়ে এসেছিলেন, সেটাও ছিল ভুয়া।

এছাড়াও অভিযোগ, ব্রিজ নির্মাণ, টিআর ও কাবিখা প্রকল্পের কাজ কাগজে-কলমে শতভাগ দেখিয়ে বিল পাস করে ট্রেজারি অফিসের মাধ্যমে পিআইও মনিরুজ্জামান সরকার নিজের ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং কার্যনির্বাহী ব্যাংকের মিঠাপুকুর শাখায় প্রায় ৩ কোটি টাকা রেখেছিলেন। সেই ঘটনা তৎকালীন সময়ে রংপুরসহ সারা দেশের তোলপাড় সৃষ্টি হয়, তুমুল বিতর্কের পর ব্যাংক থেকে টাকা তুলে চেয়ারম্যানদের দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই প্রকল্পের ১০ থেকে ২০ শতাংশ কাজ বাস্তবায়ন না করে টাকা ছাড় দিয়েছিলেন ব্যাংক এক অজানা আশংকায়।

বিগত ফ্যাসিবাদের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ও জেলায় ও পুনর্গঠন কর্মী মোস্তফা হোসেনের সঙ্গে মিলেমিশে প্রশাসনিকভাবে যেকোনো প্রকল্পের বিভিন্ন স্বার্থ, মনিরুজ্জামান সরকার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ সামাল দিতেন মোস্তফা হোসেন।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, পিআইও মনিরুজ্জামান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের এপিডি’র দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন।

তার এই সব অবৈধ সম্পদ বৈধ করার জন্য নামমাত্র লোন নিয়েছে ব্যাংক থেকে, মনিরুজ্জামান সরকার ও স্ত্রীর আফরোজা নাহারের নামে বেশ কয়েকটি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—এনআরবিসি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক।

এছাড়াও মনিরুজ্জামান তার বিপুল অবৈধ অর্থের বিনিময়ে ঢাকা শহরের বিভিন্ন ক্লাবের মেম্বার হয়েছেন।

এসব বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে মনিরুজ্জামান বলেন, আমার সম্পদসংক্রান্ত সকল বিষয়ে আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আমি অবগত করেছি, এ বিষয়ে নতুন করে কিছু বলতে চাই না।

খতিয়ে দেখার তাগিদ টিআইবির

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালক (আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কারও আয়ের সাথে যদি অসঙ্গতিপূর্ণ সম্পদ থাকে, এ বিষয়গুলো দুদক বা এ ধরনের এজেন্সি খতিয়ে দেখতে পারে। যদি তদন্তে বেরিয়ে আসে তার আয়ের সাথে অর্জিত সম্পদের মিল নেই, তাহলে তাকে অবশ্যই সম্পদ কিভাবে অর্জন করলেন এই ব্যাখ্যা দিতে হবে। এটি স্পষ্ট।