স্টাফ রিপোর্টার : , আপলোডের সময় : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬ , আজকের সময় : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬

রূপগঞ্জের বিক্রমপুর স্টিল মিলের বিস্ফোরণে শ্রমিক নিহত

পরিবেশের একাধিক অভিযানে ও বন্ধ হচ্ছে না ধোয়া, পরিবেশ দূষণ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্যোগ এলাকাবাসীর। পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান জরিমানা এবং একের পর এক দুর্ঘটনার পরও যেন থামছে না নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মৈকুলী এলাকার বিক্রমপুর স্টিল লিমিটেড কারখানার অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা। লোহা গলানোর ভাট্টি বিস্ফোরণে শ্রমিক হতাহতের পাশাপাশি কারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এতে একদিকে যেমন শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে কারখানার আশপাশের জনবসতিতে বায়ুদূষণের প্রভাব নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মিল শ্রমিক জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ভাট্টি বিস্ফোরণে একজন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় কারখানাটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এসেছে। এর আগে একই ধরনের দুর্ঘটনায় একাধিক শ্রমিক দগ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এরপরও শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সামগ্রীর ব্যবস্থা করেনি মিল কর্তৃপক্ষ। এছাড়ি পরিবেশ দূষণের অভিযোগে জরিমানার পরও প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে দেখিয়ে কালো ধোঁয়া নির্গমন অব্যাহত রেখেছে কারখানাটি । কয়েক মাসের ব্যবধানে একাধিক দুর্ঘটনা ঘটলেও নেই যেন তাদের কোন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।

জানা যায়, ২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে বিক্রমপুর স্টিলের লোহা গলানোর ভাট্টিতে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আলম হোসেন ও বরকত নামে দুই শ্রমিক দগ্ধ হন। পরে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আলম হোসেন মারা যান। একই বিস্ফোরণে গুরুতর দগ্ধ হন বরকত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক জানান, ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ‌ নাই কারন এর আগেও একই কারখানায় প্রায় একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই ভোরে লোহা গলানোর সময় ভাট্টি বিস্ফোরণে বেল্লাল, রোমান ও রাব্বানী নামে তিন শ্রমিক গুরুতর দগ্ধ হন। তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে আগুনে পুড়ে দগ্ধের ঘটনা ঘটেছে।

মিলে কর্মরত এক অপারেটর বলেন, কয়েক মাসের ব্যবধানে একই ধরনের দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। আগের দুর্ঘটনার পর কারখানা কর্তৃপক্ষ সংশোধনমূলক কোন ব্যবস্থা নেয়নি। কারখানাটির ভাট্টির কারিগরি সক্ষমতা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, রক্ষণাবেক্ষণ, জরুরি ব্যবস্থা এবং শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামসহ কোন কিছুই আপডেট করা হয়নি। লোহা গলানোর মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ শিল্পে সামান্য ত্রুটিও বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই শ্রমিকদের জন্য হেলমেট, তাপ প্রতিরোধী পোশাক, গ্লাভস, সেফটি শু, চোখ ও মুখের সুরক্ষা সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য হলেও তা করা হয়নি।

এদিকে বিক্রমপুর স্টিল কারখানাটির কালো ধোঁয়ার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করা হলেও মূলত কালো ধোয়া বন্ধ হচ্ছে না।

জানা যায়, ২০২৫ সালের ১২ মে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযানে বায়ুদূষণের দায়ে বিক্রমপুর স্টিল মিলস লিমিটেড কারখানার ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এর আগেও একই অভিযোগে পরিবেশের অভিযানে বিক্রমপুর স্টিল মিলস লিমিটেড কারখানার ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একাধিকবার জরিমানার পরও যদি কারখানা থেকে কালো ধোঁয়া নির্গমন অব্যাহত রয়েছে।

মৈকুলি এলাকার বাসিন্দা ইয়াছিন মোল্লা, কারখানার চিমনি দিয়ে নির্গত কালো ধোঁয়া আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ধোঁয়ার কারণে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি গাছপালা ও মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায়ও প্রভাব পড়ছে । আমাদের এলাকায় ঘরে ঘরে এখন শ্বাসকষ্ট রোগী পাওয়া যাচ্ছে।

এ বিষয়ে বিক্রমপুর স্টিল মিলস লিমিটেড কারখানার এজিএম সওকত আলী জানান, কারখানার কালো ধোঁয়ায় তেমন সমস্যা হচ্ছে না। কারখানার নতুন ইউনিট স্থানান্তর করা হচ্ছে সেজন্য ক্ষণিকের সমস্যা হচ্ছে।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের লেবার ইন্সপেকশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশনের তথ্য অনুযায়ী, VIKRAMPUR STEEL LTD একটি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান। সেখানে কারখানাটির ঠিকানা রূপসী, রূপগঞ্জ এবং মোট শ্রমিক সংখ্যা ৮০ জন উল্লেখ রয়েছে। নিবন্ধনের মেয়াদ ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। তবে সরকারি নিবন্ধন থাকা মানেই কারখানার সব ধরনের নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ব্যবস্থা যথাযথভাবে কার্যকর—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং দুর্ঘটনা ও দূষণের অভিযোগের পর কারখানাটির সর্বশেষ নিরাপত্তা পরিদর্শন কবে হয়েছে, কী ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেছে এবং সেগুলো এখন দেখা জরুরী হয়ে পড়েছে।

জানুয়ারির ভাট্টি বিস্ফোরণের পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিল পুলিশ। কিন্তু দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ আজোও পর্যন্ত জানা যায়নি। ভাট্টিতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল কি না, অতিরিক্ত তাপ বা চাপ তৈরি হয়েছিল কি না, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছিল কি না, শ্রমিকরা প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার করছিলেন কি না কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তের কর্মরত শ্রমিকরা । কারখানাটিতে শ্রমিক সুরক্ষার জন্য ভাট্টির নিয়মিত কারিগরি পরীক্ষা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি বহির্গমন পথ, প্রশিক্ষিত ফায়ার সেফটি টিম এবং দুর্ঘটনার সময় দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে না। একাধিক দুর্ঘটনার পর এসব বিষয় নতুন করে যাচাই করার দাবি উঠেছে এলাকাবাসীর। স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী।

বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শ্বাসতন্ত্রের ওপর পড়তে পারে। তবে বিক্রমপুর স্টিলের নির্গত ধোঁয়ার কারণে স্থানীয়দের নির্দিষ্ট কোনো রোগ হচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও চিকিৎসাবিষয়ক তথ্য প্রয়োজন।

তাই পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগেরও উচিত শিল্পাঞ্চলটির বায়ুদূষণের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা।
বিক্রমপুর স্টিলের ক্ষেত্রে একদিকে ভাট্টি বিস্ফোরণে শ্রমিকের মৃত্যু, অন্যদিকে বায়ুদূষণের অভিযোগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিমানার তথ্য সবকিছু মিলিয়ে কারখানাটির কার্যক্রম নিয়ে একটি সমন্বিত পরিদর্শন প্রয়োজন ।

শুধু জরিমানা করে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। দূষণ বন্ধ হয়েছে কি না, শ্রমিক নিরাপদ কি না এবং পূর্বের দুর্ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে কারখানায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না—তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কারণ একজন শ্রমিকের জীবন কিংবা একটি এলাকার মানুষের সুস্থ পরিবেশ কোনো জরিমানার অঙ্ক দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

এই পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে স্থানীয়দের দাবি—বিক্রমপুর স্টিলের পরিবেশগত ও শ্রমিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে পরিদর্শন করা হোক, দুর্ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণ করা হোক এবং কালো ধোঁয়া নির্গমন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

শিল্পায়ন দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শিল্পকারখানার উৎপাদনের পাশাপাশি শ্রমিকের নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষাও নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও শিল্পমালিক—উভয়ের দায়িত্ব।