মোরেলগঞ্জ প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬ , আজকের সময় : শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

মোরেলগঞ্জে দুই বছরের শিশুকে সড়কে ফেলে পালালেন মা, মানবিকতায় পাশে দাঁড়ালেন ইউএনও

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে মাত্র দুই বছরের এক শিশুকে সড়কের পাশে ফেলে রেখে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার মায়ের বিরুদ্ধে। পরে শিশুটিকে দাদির কাছে নিয়ে যাওয়া হলেও তিনিও দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানালে ফের তাকে রাস্তায় রেখে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। অবশেষে অসহায় শিশুটির কান্না থামাতে এগিয়ে আসেন স্থানীয়রা। শিশুটিকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে।

সেখানে শিশুটির দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষেত্রে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হাবিবুল্লাহ। অসহায় শিশুটিকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তার নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় যত্নের ব্যবস্থা করেন তিনি।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টার দিকে উপজেলার ১৪ নম্বর বারইখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় জেলে পাড়ার একটি ইটভাটার সামনের সড়কে হৃদয়বিদারক এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যার দিকে সড়কের পাশে একা শিশুটিকে কাঁদতে দেখে কয়েকজন এগিয়ে যান। পরে শিশুটিকে উদ্ধার করে তার দাদির কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু দাদিও শিশুটির দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে আবারও সড়কের পাশে রেখে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দেয়। পরে তারা শিশুটিকে নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবনে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শিশুটির বাবা বারইখালী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. পলাশ এবং মা মোসা. মিতু আক্তার। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রায় তিন মাস আগে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। শুক্রবার শিশুটির মা মিতু আক্তার শিশুটিকে ইটভাটার সামনের সড়কে রেখে ঢাকার উদ্দেশ্যে চলে যান বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ঘটনার পর শিশুটির বাবা মো. পলাশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হাবিবুল্লাহ। এ সময় পলাশ জানান, তিনি বর্তমানে মোরেলগঞ্জের বাইরে রয়েছেন। পরে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তিন দিনের মধ্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সন্তানকে নিজের দায়িত্বে নেওয়ার কথা জানান তিনি।

তবে এরই মধ্যে শিশুটির নিরাপত্তা ও তাৎক্ষণিক প্রয়োজনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে আসেন ইউএনও মোঃ হাবিবুল্লাহ। অসহায় শিশুটিকে নিজের কোলে তুলে নেন তিনি। শিশুটির পরনে প্রয়োজনীয় পোশাক না থাকায় নিজের বাসা থেকে জামা-কাপড় এনে তাকে পরিয়ে দেন। পরে শিশুটির জন্য খাবারেরও ব্যবস্থা করেন তিনি।

শিশুটির সাময়িক নিরাপত্তা ও দেখভালের বিষয়টি নিশ্চিত করতে তার ফুফু রেসমা খাতুনের কাছে সবার উপস্থিতিতে তিন দিনের ভরণ-পোষণের জন্য আর্থিক সহায়তা দিয়ে সাময়িকভাবে শিশুটিকে হস্তান্তর করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

একদিকে আপনজনদের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে যখন মাত্র দুই বছরের শিশুটি অসহায় অবস্থায় রাস্তায় পড়ে ছিল, অন্যদিকে প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার এমন তাৎক্ষণিক মানবিক ভূমিকা স্থানীয়দের মধ্যে প্রশংসার সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়রা বলছেন, প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি একজন অসহায় শিশুর প্রতি ইউএনওর এই সহমর্মিতা সত্যিই মানবিকতার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

এদিকে শিশুটির বাবা মো. পলাশকে আগামী সোমবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে জরুরি ভিত্তিতে উপস্থিত হওয়ার জন্য তলব করা হয়েছে। শিশুটির ভবিষ্যৎ অভিভাবকত্ব, নিরাপত্তা ও আইনগত বিষয়গুলো বিবেচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

মাত্র দুই বছরের শিশুটির জীবনে এরই মধ্যে ঘটে গেছে বিচ্ছেদের নির্মমতা। মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর রাস্তায় একা পড়ে থাকা, এরপর দাদির কাছ থেকেও আশ্রয় না পাওয়া সব মিলিয়ে ঘটনাটি নাড়া দিয়েছে স্থানীয়দের বিবেককে।

যে বয়সে একটি শিশুর মায়ের কোলে নিরাপদে থাকার কথা, সেই বয়সেই তার ঠাঁই হয়েছে সড়কের পাশে। তবে সেই অন্ধকার মুহূর্তে স্থানীয়দের পাশাপাশি মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হাবিবুল্লাহ।

এখন স্থানীয়দের প্রত্যাশা শিশুটির জন্য যেন শুধু সাময়িক আশ্রয় নয়, বরং তার নিরাপদ ভবিষ্যৎ, যথাযথ অভিভাবকত্ব, শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। একই সঙ্গে শিশুটির বিষয়ে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।