মনজুর মোরশেদ তুহিন (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ , আজকের সময় : বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

“বরাদ্দ আছে, সুব্যবস্থা নেই: পটুয়াখালী পিটিআইয়ে অনিয়মের ছাপ”

প্রাথমিক শিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পটুয়াখালী প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই)। ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানটির রয়েছে বিশাল ক্যাম্পাস, একাধিক একাডেমিক ও আবাসিক ভবন, দিঘী, মসজিদ, পরীক্ষণ বিদ্যালয়, প্রশাসনিক ভবন ও সুপার কোয়ার্টার। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারি অর্থও নিয়মিত বরাদ্দ হওয়ার কথা।

কিন্তু এতসব সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও অবকাঠামো থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান চিত্রে দেখা যাচ্ছে ব্যবস্থাপনার নানা দুর্বলতা। আবাসিক প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য নিয়মিত পানি সরবরাহ নেই, হোস্টেলের পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াতের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত একটি ভবন মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি অর্থে পরিচালিত একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে এসব মৌলিক সমস্যা কেন দীর্ঘদিন ধরে রয়ে গেছে? পানি সরবরাহ, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা ও ভবন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার সুফল বাস্তবে কতটা পাওয়া যাচ্ছে? প্রতিবছর বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার কতটা মিল রয়েছে এ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পিটিআই কমপ্লেক্সে আটটি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে সম্মুখভাগের একটি ভবন দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। দরজা-জানালা না থাকায় ভবনটি এখন অনেকটা ভূতুড়ে স্থাপনায় পরিণত হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থী ও সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সেখানে নিয়মিত বহিরাগত ও মাদকসেবীদের আনাগোনা রয়েছে।

একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে বছরের পর বছর একটি ঝুঁকিপূর্ণ ও অচল ভবন পড়ে থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভবনটি সরকারি ভাবে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে অপসারণ কিংবা নিরাপদে ঘিরে রাখার উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি, তা নিয়েও জানতে চান সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে পিটিআইয়ের পুরুষ হোস্টেলে গত ২৭ আগস্ট থেকে তীব্র পানি সংকট চলছে বলে জানিয়েছেন আবাসিক প্রশিক্ষণার্থীরা। পানির অভাবে গোসল, কাপড় ধোয়া ও বাথরুম ব্যবহারে চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি হোস্টেলের বিভিন্ন অংশ অপরিচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।

বর্তমানে পিটিআইয়ে ১০ মাস মেয়াদি বিটিপিটি প্রশিক্ষণ চলছে। জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এ প্রশিক্ষণের আর মাত্র দুই মাস বাকি। নারী ও পুরুষ প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য পৃথক হোস্টেল থাকলেও নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সমস্যার কারণে অধিকাংশ প্রশিক্ষণার্থী হোস্টেলে থাকতে অনাগ্রহী বলে জানা গেছে।

তিনতলা পুরুষ হোস্টেলের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় বর্তমানে ২৩ জন পুরুষ শিক্ষক অবস্থান করছেন। বাকিরা বাইরে বাসা ভাড়া করে থাকছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রশিক্ষণার্থী বলেন, ‘পানি না থাকায় টানা দুই দিন গোসল করতে পারিনি। কাপড়চোপড় ধুতে পারছি না। আমরা অত্যন্ত ভয় নিয়ে এখানে থাকছি। যেকোনো সময় বহিরাগতরা এসে আমাদের বাথরুম এমনকি রুমেও ঢুকে পড়ে। বিষয়টি পিটিআই সুপারকে একাধিকবার জানিয়েছি। কিন্তু কার্যকর সমাধান পাইনি।’

শুধু পানি নয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে। প্রশিক্ষণার্থীদের অভিযোগ, ক্যাম্পাসের ভেতরে বহিরাগতদের আনাগোনা রয়েছে। তাদের মধ্যে মাদকসেবীরাও রয়েছে বলে দাবি করেছেন তারা। মাঝেমধ্যে বৈদ্যুতিক তার ও বাথরুমের ট্যাপ চুরি হওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পিটিআইয়ে ১১ জন কর্মকর্তা ও ৯ জন কর্মচারী রয়েছেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির সুপারিনটেনডেন্টের দাবি, অনুমোদিত ২৫টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত মাত্র ৯ জন। এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, সরকারি জনবল কাঠামো ও অর্থ বরাদ্দের বিপরীতে বাস্তবে কতজন দায়িত্ব পালন করছেন এবং কোন কোন পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে?

এছাড়া বিভিন্ন ভবনে মাস্টাররোলের কর্মী দিয়ে কাজ চালানোর তথ্যও পাওয়া গেছে। তাদের অনেকে চাকরি স্থায়ী হওয়ার আশায় কাজ করছেন বলে জানা গেছে। এসব কর্মীর নিয়োগ, দায়িত্ব, পারিশ্রমিক এবং সরকারি হিসাবের আওতায় তাদের ব্যয়ের বিষয়টিও যাচাইয়ের দাবি রাখে।

পিটিআইয়ের মতো আবাসিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পানি, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও জনবল এসব কোনো বিলাসিতা নয়; প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার মৌলিক শর্ত। ফলে এসব খাতে সরকারি বরাদ্দ ও ব্যয় থাকলে সেই অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং তার বাস্তব ফলাফল কোথায় তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

বিশেষ করে পানি সরবরাহ ও ভবন রক্ষণাবেক্ষণের মতো নিয়মিত ব্যয়ের ক্ষেত্রে ব্যয়ের কাগজপত্রের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। একইভাবে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত জনবল, তাদের দায়িত্ব পালনের রেকর্ড এবং মাস্টাররোল কর্মীদের নিয়োগ ও পারিশ্রমিকের হিসাবও যাচাই করা জরুরি।

পিটিআইয়ের সুপারিনটেনডেন্ট (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের লোকবল অত্যন্ত সংকট। প্রতিষ্ঠানের ২৫টি পদের বিপরীতে মাত্র ৯ জন কর্মরত রয়েছেন। বহিরাগত ও মাদকসেবীরা নিয়মিত ক্যাম্পাসের ভেতরে যাতায়াত করে। পর্যাপ্ত বাউন্ডারি ওয়াল নেই। উঁচু বাউন্ডারি ওয়াল প্রয়োজন।’

তবে সরকারি বরাদ্দ ও ব্যয়ের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি রেজুলেশনসহ চিঠির মাধ্যমে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তথ্য নেওয়ার কথা জানান।

ফলে এখন মূল প্রশ্ন, সরকারি অর্থে পরিচালিত একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বরাদ্দ ও অবকাঠামো থাকার পরও কেন পানি সংকট, অপরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তাহীনতা ও পরিত্যক্ত ভবনের মতো সমস্যা থাকবে? বিভিন্ন খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ কি যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে? কাগজে-কলমে যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে, তার বাস্তব প্রতিফলন কোথায়?

এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে পিটিআইয়ের গত কয়েক অর্থবছরের রাজস্ব ও উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ, খাতভিত্তিক ব্যয়, বিল-ভাউচার, ক্রয়সংক্রান্ত নথি, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, পানি সরবরাহ, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ, আসবাবপত্র ও হোস্টেল ব্যবস্থাপনার ব্যয়ের হিসাব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। পাশাপাশি নথির সঙ্গে সরেজমিন বাস্তবতার তুলনা করলেই বেরিয়ে আসতে পারে সমস্যাগুলো নিছক জনবল সংকট ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, নাকি সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে কোনো অনিয়ম।