রিপোর্টারের নাম , আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ , আজকের সময় : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সরকারি শিক্ষক হয়েও সমবায় সমিতির নির্বাচনে সভাপতি প্রার্থী: আইন ও আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে চার দপ্তরে তোলপাড়

সরকারি চাকরি বিধিমালা ও সমবায় আইন তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার অপব্যবহার, দাপ্তরিক অনাপত্তিপত্র (NOC) না থাকা এবং ঋণখেলাপির দায়ে অভিযুক্ত হয়েও বাণিজ্যিক ঋণদানকারী সমবায় সমিতির নির্বাচনে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ দরগা শরীফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বিপুল চন্দ্র হালদারের বিরুদ্ধে।

​‘মির্জাগঞ্জ হিন্দু কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লিমিটেড’-এর ২০২৬ সালের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচনে বিপুল চন্দ্র হালদার (সদস্য নম্বর: ১৮৩) সভাপতি পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করার পর এ নিয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং সমবায় বিভাগে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

​অনুসন্ধানে জানা যায়, বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের লিখিত পূর্বানুমতি ছাড়া সরকারি শিক্ষকের এই প্রার্থিতা একাধিক সরকারি বিধিমালা ও আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত শিক্ষকের প্রার্থিতা বাতিল ও বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে চার প্রধান প্রশাসনিক দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন উক্ত নির্বাচনের অপর প্রতিদ্বন্দ্বী সভাপতি পদপ্রার্থী বিমল চন্দ্র বালা (সদস্য নম্বর: ৭১)। অভিযোগপত্রটির অনুলিপি জেলা শিক্ষা অফিসার (পটুয়াখালী), উপজেলা শিক্ষা অফিসার (মির্জাগঞ্জ), জেলা সমবায় অফিসার (পটুয়াখালী) এবং উপজেলা সমবায় অফিসার (মির্জাগঞ্জ) বরাবর পাঠানো হয়েছে।

​অভিযোগের বিস্তারিত আইনি ভিত্তি ও ধারা বিশ্লেষণ:

আইন বিশেষজ্ঞদের সুনির্দিষ্ট ধারা ও বিধি উল্লেখ করে অভিযোগপত্রে বলা হয়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের এই অংশগ্রহণ সম্পূর্ণ বেআইনি:

​সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ১৭ (বাণিজ্য ও চাকরি): সুদের বিনিময়ে ঋণ প্রদান ও লভ্যাংশ বণ্টনকারী ক্রেডিট ইউনিয়ন সরাসরি বাণিজ্যিক ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান। কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন (NOC) ছাড়া সরকারি কর্মচারী এমন পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন না।

​সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর বিধি ২৫: সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বার্থের সংঘাত (Conflict of Interest) বা দাপ্তরিক দায়িত্ব বিঘ্নিত হয়—এমন কোনো সংস্থার নির্বাচনে সরকারি কর্মচারী প্রার্থী হতে পারবেন না।

​সমবায় সমিতি আইন, ২০০১ (সংশোধিত ২০১৩)-এর ধারা ১৯ (গ ও ঘ): দাপ্তরিক দায়িত্বের সাথে স্বার্থের সংঘাত থাকলে বা অন্য কোনো প্রচলিত আইনে অযোগ্য বিবেচিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সমবায় সমিতির ব্যবস্থাপনা কমিটির পরিচালক হতে পারেন না।

​সমবায় সমিতি বিধিমালা, ২০০৪-এর বিধি ৫০ (মনোনয়ন বাতিল): সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধি অনুযায়ী অনাপত্তিপত্র দাখিল না করলে নির্বাচন কমিটির মনোনয়নপত্র সরাসরি বাতিল করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

​সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ধারা ৩৯ (অসদাচরণ): দাপ্তরিক ক্ষমতার বাইরে অনুমতিহীন বাণিজ্যিক যোগসাজশকে “অসদাচরণ” (Misconduct) হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

​প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র: প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব বাদ দিয়ে ক্রেডিট ইউনিয়নের নিয়মিত দাপ্তরিক ও ব্যাংকিং কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়া শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

​উপজেলা সমবায় কর্মকর্তার বিতর্কিত ভূমিকা ও অনিয়মের নানা অভিযোগ:

সমিতির নির্বাচনী আইনের স্পষ্ট ধারা অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী ঋণখেলাপি প্রমাণিত হলে তার প্রার্থিতা সরাসরি বাতিল হওয়ার কথা। অনুসন্ধান বলছে, মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের দিনে সভাপতি পদপ্রার্থী বিপুল চন্দ্র হালদার ঋণখেলাপি হিসেবে প্রমাণিত হন। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে তার নিজ সঞ্চয়ী হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করে ঋণের বকেয়া টাকা জমা দেয়ার সুযোগ করে দিয়ে নির্বাচন কমিশন তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

​অভিযোগ উঠেছে, মির্জাগঞ্জ উপজেলা সমবায় অফিসার ও নির্বাচন কমিশনার কামরুল আহসান মিঞা মোটা অঙ্কের অর্থ বাণিজ্যের মাধ্যমে এই অবৈধ প্রার্থিতাকে বৈধতা দিয়েছেন। বাতিলের বদলে বিপুল চন্দ্র হালদারকে ফরম দাখিলের সুযোগ করে দেয়া এবং প্রকাশ্যে তার পক্ষে সাফাই গাওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।

​স্থানীয়দের দাবি, সমবায় কর্মকর্তা কামরুল আহসানের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নিত্য দিনের। তিনি সমিতি অডিটের নামে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা নেন বলে জানা গেছে। অর্থের বিনিময়ে একই ব্যক্তিকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের সভাপতি করার নজিরও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

ছবি: মির্জাগঞ্জ উপজেলা সমবায় অফিসার ও নির্বাচন কমশিনার মো. কামরুল আহসান মিঞা।

​বিপুল হালদারের কোটি টাকার সাম্রাজ্য ও দুদক তদন্তের দাবি:

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, অভিযুক্ত বিপুল চন্দ্র হালদার বিগত দিনে টানা ১২-১৫ বছর এই সমিতির সভাপতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন। দীর্ঘকাল পদে থাকার সুবাদে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের মাধ্যমে তিনি বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। দুর্নীতির অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪ তলা ফাউন্ডেশনসহ একটি আলিশান প্রাসাদসম বাড়ি নির্মাণ করেছেন। একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের সীমিত আয়ে কীভাবে এমন বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ সম্ভব হলো, তা নিয়ে জনমনে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সমিতির সদস্যরা এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশু তদন্ত দাবি করেছেন।

ছবি: অভিযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বিপুল চন্দ্র হালদারের প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার আলিশান বাড়ি।

​প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য:

অভিযোগকারী বিমল চন্দ্র বালা বলেন, “একজন শিক্ষক সরকারি বেতন ও সুবিধা গ্রহণ করে অনৈতিকভাবে বাণিজ্যিক সমিতির সভাপতির পদে লড়ছেন। একইসঙ্গে তিনি ঋণখেলাপি হওয়া সত্ত্বেও সমবায় কর্মকর্তা যোগসাজশ করে তার প্রার্থিতা বহাল রেখেছেন। এতে সাধারণ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং প্রাথমিক শিক্ষার পরিবেশ ভেস্তে যাচ্ছে। আমরা অবিলম্বে উনার প্রার্থিতা বাতিল ও বিভাগীয় শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।”

​পটুয়াখালী জেলা শিক্ষা অফিস ও উপজেলা সমবায় অফিস সূত্রে জানা যায়, লিখিত অভিযোগপত্রগুলো গুরুত্বের সাথে নথিভুক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে অনাপত্তিপত্রের অনুপস্থিতি ও নির্বাচনী বিধিবহির্ভূত সুবিধার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রার্থিতা বাতিলসহ সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে অভিযুক্ত বিপুল চন্দ্র হালদার বলেন, এগুলার জন্য কোন অনুমতি লাগেনা তাছাড়া আমি বিগত অনেক বছর যাবত নির্বাচন করছি এবং দায়িত্ব পালন করছি, এটার নির্বাচন কমিশনার উপজজেলা সমবায় অফিসার তারো তো কিছু বলে নাই, এ ছাড়া জেলা সমবায় অফিসারও বিষয়টি জ্ঞাত। আপিনি সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্বেও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কিভাবে দায়িত্ব পালন করছেন জানতে চাইলে তিনি তার কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।

মির্জাগঞ্জ উপজেলা সমবায় অফিসার ও নির্বাচন কমশিনার মো. কামরুল আহসান মিঞা বলেন, এটা সরকারি/বেসরকারি সব ধরনের ব্যক্তিদের নিয়েই করা হয়। একজন সরকারি কর্মকর্তা অনুমতি ছাড়া আরেকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হতে পারবে কিনা জানতে চাইলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেনি।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মুজিবুর রহমান বলেন, আমি এটা নিয়ে বিস্তারিত জানার পরে এবং সমবায় আইন দেখে বলতে পারবো। সরকারি বিধি-মালার কথা উল্লেখ করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

পটুয়াখালী জেলা শিক্ষা অফিসার মো. মাসুদ করিম বলেন, অভিযোগ পেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।

পটুয়াখালী জেলা সমবায় অফিসার সুব্রত কুমার ঘোষ বলেন, একটি অভিযোগ পেয়েছি বিষয়টি খতিয়ে দেখে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।