পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দীর্ঘ ৩১ বছর ধরে ভোগদখলে থাকা বসতভিটা জোরপূর্বক দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। দখলচেষ্টার সময় বাড়িটি ঘেরাও করে পরিবারের সদস্যদের অবরুদ্ধ, প্রাণনাশের হুমকি এবং মামলা দিয়ে হয়রানির ভয় দেখানোরও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী মো. সেলিম মুন্সী। এ ঘটনায় পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) কুয়াকাটার মুছল্লিয়াবাদ এলাকার বাসিন্দা মো. সেলিম মুন্সী সংবাদ সম্মেলন করে এসব অভিযোগ করেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি নিজের ও পরিবারের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে প্রশাসন ও পুলিশ সুপারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে সেলিম মুন্সী দাবি করেন, ১৯৯৫ সালে এসএ খতিয়ানমূলে সংশ্লিষ্ট জমি ক্রয় করে তিনি সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে সরকারি জরিপে তার নামে বিএস ১১২২ নম্বর খতিয়ানের ৪০৯১ নম্বর দাগে জমিটির চূড়ান্ত রেকর্ড প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে প্রায় ৩১ বছর ধরে তিনি ও তার পরিবার ওই বসতভিটায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন।
সম্প্রতি জমিটি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে প্রতিকার চেয়ে তিনি কলাপাড়া সিনিয়র সিভিল জজ আদালতের শরণাপন্ন হন। তার দাবি, গত ২ সেপ্টেম্বর আদালত বিবাদী জাহিদুর ইসলাম সুমনের বিরুদ্ধে বিরোধপূর্ণ জমির ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।
তবে আদালতের ওই আদেশ জারির মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দখলের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন সেলিম মুন্সী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর সকালে জাহিদুর ইসলাম সুমন একদল বহিরাগত লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে তাদের বাড়ির সামনে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে তারা বাড়িটি ঘিরে ফেলেন এবং পরিবারের সদস্যদের বাইরে বের হতে বাধা দিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ সময় প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তার।
সেলিম মুন্সী বলেন, আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পর থেকেই তিনি ও তার পরিবারের সদস্যরা আরও বেশি আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে বাড়িতে থাকা শিশু, অসুস্থ স্ত্রী ও বৃদ্ধ বাবার নিরাপত্তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, বাড়ির বাইরে অপরিচিত লোকজনের অবস্থান ও হুমকির কারণে তার চার ও নয় বছর বয়সী দুই নাতি আতঙ্কে কান্নাকাটি করছে। পরিবারের অসুস্থ ও বয়স্ক সদস্যরাও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের আইনি প্রতিকার চাইতে যাওয়ায় প্রতিপক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে তার ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন মামলায় জড়ানোর হুমকি দিচ্ছে। পুরো পরিবারকে পাঁচটি মিথ্যা মামলায় হয়রানি করার ভয় দেখানো হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনার বিষয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর মহিপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান সেলিম মুন্সী। তার দাবি, জিডিতে পরিবারের নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রতিপক্ষের হুমকির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। জিডি নম্বর ৩৭৮।
সংবাদ সম্মেলনে সেলিম মুন্সী আরও দাবি করেন, কুয়াকাটায় পর্যটকদের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি একটি শীর্ষস্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যাদের নাম উঠে এসেছিল, তাদের কয়েকজনও বর্তমান জমি বিরোধে জড়িত। তার অভিযোগ, ওই কথিত চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা এক ব্যক্তি জাহিদুর ইসলাম সুমনের পক্ষ নিয়ে তাদের পরিবারকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিচ্ছেন।
তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে কথিত ‘প্রতারক চক্রের’ সঙ্গে জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগের বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট নথি ও অন্যান্য পক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
সেলিম মুন্সীর অভিযোগ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও যদি কোনো পক্ষ জোরপূর্বক জমির দখল নেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয় নয়; বরং আদালতের আদেশের কার্যকারিতা ও আইনের শাসন নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে। তাই তিনি বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং আদালতের আদেশ বাস্তবায়নে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা দাবি করেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত জাহিদুর ইসলাম সুমনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, জমির মালিকানা ও দখল সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি আদালতেই হোক। কিন্তু আদালতের নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা অবস্থায় কোনো পক্ষ যাতে বলপ্রয়োগ বা ভয়ভীতি দেখিয়ে পরিস্থিতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ প্রয়োজন।