নিজস্ব প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ , আজকের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬

মিরপুরে অনুমোদনহীন ৩ তলা ভবন! নির্মাণ বন্ধ ও অনুমোদনপত্র জমা দেয়ার নির্দেশ রাজউকের

রাজধানীর মিরপুরে অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণ অনুমোদনপত্র প্রদর্শনে ব্যর্থ হওয়ায় একটি তিনতলা ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। একই সঙ্গে সাত দিনের মধ্যে ভবনটির অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণ অনুমোদনপত্র জমা দিতে মালিককে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও এসব কাগজপত্র জমা পড়েনি বলে জানিয়েছেন রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এদিকে, ভবনটি অবৈধভাবে তিন তলা পর্যন্ত সম্পন্ন  করা হলেও রাজউকের পক্ষ থেকে ওই একটি চিঠি ছাড়া রাজউকের কর্মকান্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে রাজউকের পক্ষ থেকে প্রয়োজনে আরও নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি আগামী মাসে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হলেও তা অধৌ কার্যকর করা হবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ থেকেই যায়।

‎গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রাজউকের জোন-৩ (মহাখালী জোনাল অফিস)-এর জোন-৩/১-এর অথরাইজড অফিসার এফ আর আশিক আহমেদ স্বাক্ষরিত এক নোটিশে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। নোটিশের স্মারক নম্বর: ২৫.০৬.০০০০.০০০.০৯৮.৩২.০২৪৭.২৬.৫১৯ [1]

‎সাইট পরিদর্শনে মেলেনি অনুমোদিত নকশা:

‎রাজউকের নোটিশ অনুযায়ী, ঢাকা মহাপরিকল্পনাভুক্ত এলাকার আওতাধীন মিরপুর সেকশন-১২-এর ব্লক-সি, রোড-০৭, বাসা-২০ ঠিকানায় মুজাহিদ নামে এক ব্যক্তির একটি তিনতলা ভবন রয়েছে। সাইট পরিদর্শনের সময় ভবনটির মালিক রাজউক অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণ অনুমোদনপত্র দেখাতে পারেননি বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

নোটিশে আরও বলা হয়, ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২-এর ৩ ধারা অনুযায়ী ইমারত নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা থাকা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া আইনের ১০(২) ধারা অনুযায়ী, সাইট পরিদর্শনের সময় ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণ অনুমোদনপত্র প্রদর্শন করতে হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পরিদর্শনের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন ভবনমালিক। নির্মাণকাজ শুরুর আগে রাজউককে অবহিত করা হয়নি বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

‎এ অবস্থায় নোটিশ পাওয়ার সাত দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রাজউকের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত ভবনটির সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

নির্দেশনা অমান্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ করা না হলে ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা, ২০২৫ এবং ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ (সংশোধনীসহ) অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায় রাজউক।

‎ডেসকোকে ইউটিলিটি সংযোগ না দেওয়ার অনুরোধসহ পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে রাজউক:

বিষয়টিকে জরুরি বিবেচনায় নিয়ে নোটিশের অনুলিপি তিতাস গ্যাস, ঢাকা ওয়াসা এবং ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (ডেসকো) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে। ভবনটিতে যাতে কোনো ধরনের ইউটিলিটি বা সেবা সংযোগ দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) সংশ্লিষ্ট প্লটে সব ধরনের নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণকাজ বন্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানানো হয়।

রাজউকের চিঠি পেয়েছি, আইনগত সহায়তা দেব:

পল্লবী থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত এএসআই মিজানুর রহমান বলেন, “হ্যাঁ, আমরা রাজউকের একটি চিঠি পেয়েছি। ভবনমালিককে বাড়ির সব কাজ বন্ধ রাখার জন্য বলা হয়েছে। আমাদের এর বেশি কোনো দায়িত্ব নেই। যা করার রাজউক করবে। তবে রাজউক যদি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অবৈধ বাড়িটি ভেঙে ফেলতে চায়, তখন আমরা আইনগত সহায়তা দেব।”

কাগজপত্র জমা না দিলে মোবাইল কোর্টে ব্যবস্থা:

রাজউকের ইমারত পরিদর্শক (জোন-৩/১) মো. আক্তারুজ্জামান ফয়েজ বলেন, “তারা এখন পর্যন্ত চিঠির কোনো জবাব বা অনুমোদনপত্র জমা দেয়নি। আরও চিঠি ইস্যু করা হবে। এরপরও কাগজপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হলে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ভবনটি ভেঙে ফেলা হবে।”

রাজউকের জোন-৩/১-এর অথরাইজড অফিসার এফ আর আশিক আহমেদ বলেন, “তাদের একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে আরও একটি চিঠি দেওয়া হবে। এরপরও যদি তারা কাগজপত্র জমা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আগামী মাসে মোবাইল কোর্ট করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সাংবাদিক পরিচয় শুনে ফোন বিচ্ছিন্ন, পরে হুমকির অভিযোগ:

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ভবনমালিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ফোন বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

পরবর্তীতে মিন্টু নামে এক ব্যক্তি নিজেকে বিএনপি নেতা ও ভবনমালিকের আত্মীয় পরিচয় দিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি প্রতিবেককে বিভিন্ন ধরনের হুমকি-ধমকি দিয়ে বলেন, “এটা নিয়ে আপনাদের সাংবাদিকদের কী কাজ? আপনারা কী করবেন? আমরা সিটি করপোরেশনকে ম্যানেজ করেছি, পল্লবী থানা পুলিশকে ম্যানেজ করেছি আর রাজউককেও ম্যানেজ করে ফেলব।”

ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রাজধানী, বাড়ছে উদ্বেগ:

রাজধানী ঢাকার ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, সরু সড়ক এবং ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এসব সীমাবদ্ধতা উদ্ধারকাজ ব্যাহত করার পাশাপাশি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ভবনের নকশা অনুমোদন, নির্মাণবিধি অনুসরণ, মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুমোদনহীন নির্মাণের ক্ষেত্রে এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

‎একটি ভবনের অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণ অনুমোদনপত্র না দেখাতে পারা ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তাহীনতার চূড়ান্ত প্রমাণ! প্রয়োজনীয় নথি যাচাই এবং নির্মাণবিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।

রাজউকের ভূমিকা কি শুধু নোটিশেই সীমাবদ্ধ?

নগর পরিকল্পনা ও ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে মিরপুরের এই ভবনকে ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—নির্ধারিত সময় পার হলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে পারেননি ভবন মালিক। কিন্তু তারপরেও এখন পর্যন্ত আর কোন পদক্ষেপ নেননি রাজউক। যার কারনে প্রশ্ন উঠতেই পারে যে এক নোটিশেই সীমাবদ্ধ রাজউক? সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

‎ভবনটির অনুমোদনসংক্রান্ত নথি যাচাই, নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। একই সঙ্গে ভবনটির কাঠামোগত নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রয়োজন আছে কি না, তা যথাযথ কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে নির্ধারণ করা জরুরি।

নোটিশ, নির্দেশনা আর আশ্বাসের বাইরে গিয়ে রাজউক কি কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, নাকি বিষয়টি আরও কয়েকটি চিঠির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে—এখন সেটিই দেখার বিষয়।

‎