বিয়ের আশ্বাসে সম্পর্ক গড়ে তোলা, জোরপূর্বক ধর্ষণ, ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ও ছবি ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল এবং বিভিন্ন অজুহাতে ১৫ লাখ টাকার বেশি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পটুয়াখালীর স্থানীয় ঠিকাদার জাহাঙ্গীর হোসেন গাজীর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ তুলে অভিযুক্তের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, আত্মসাৎ করা অর্থ ফেরত এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন শিলা আক্তার নামে এক নারী। এ ঘটনায় আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল ১১টায় পটুয়াখালী রিপোর্টার্স ইউনিটির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন শিলা আক্তার। অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর হোসেন গাজী পটুয়াখালী পৌরসভার পশ্চিম কালিকাপুরের শ্যামলী সড়কের বাসিন্দা ময়েজউদ্দিন গাজীর ছেলে।
সংবাদ সম্মেলনে শিলা আক্তার অভিযোগ করেন, পরিচয়ের পর জাহাঙ্গীর তাঁর মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেন এবং বিভিন্নভাবে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তাঁকে শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে চাপ দেন। তাঁর দাবি, আপত্তি সত্ত্বেও ভাড়া বাসায় প্রবেশ করে জোরপূর্বক তাঁকে ধর্ষণ করেন জাহাঙ্গীর। এ সময় তাঁর চিৎকার থামাতে মুখ চেপে ধরে বিবস্ত্র অবস্থার ভিডিও ধারণ ও ছবি তোলা হয়। পরে বিষয়টি কাউকে জানালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেসব ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শিলার দাবি, ওই ভিডিও ও ছবিকে হাতিয়ার করে তাঁকে ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং পরবর্তী কয়েক মাসে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। একপর্যায়ে বিয়ের বিষয়ে চাপ দিলে জাহাঙ্গীর তাঁকে পটুয়াখালী নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে নিয়ে হলফনামা করান। এতে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে তাঁকে বোঝানো হয়। তবে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে শরিয়তসম্মতভাবে বিয়ে, কলেমা পাঠ এবং কাবিননামা নিবন্ধনের কথা বলেন তিনি। কিন্তু জাহাঙ্গীর তাতে রাজি হননি বলে অভিযোগ শিলার।
এরপর ঠিকাদারি কাজের জন্য অর্থের প্রয়োজন দেখিয়ে টাকা দাবি করা হয় বলে জানান তিনি। বিয়ের আশ্বাসে চাপের মুখে নিজের স্বর্ণালংকার বিক্রি করে এবং বাবার বাড়ি থেকে কয়েক দফায় টাকা এনে জাহাঙ্গীরকে দিয়েছেন বলে দাবি করেন শিলা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে ১৫ লাখ টাকার বেশি অর্থ নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ তাঁকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে রক্ষিতা হিসেবে থাকার প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। শিলার দাবি, এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর থেকেই তিনি আরও অনিশ্চয়তা ও হয়রানির মধ্যে পড়েন।
শিলা আক্তার জানান, অভিযোগগুলোর প্রতিকার চেয়ে তিনি আদালতে মামলা করেছেন। মামলাটি তদন্তের জন্য পটুয়াখালী সদর থানাকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত বলে দাবি করেন তিনি। তবে মামলা-সংক্রান্ত নথি, আদালতের আদেশ এবং তদন্তের বর্তমান অগ্রগতি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরও তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। তাঁকে গায়েব করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। অভিযুক্ত বিভিন্ন মহলে পুলিশকে অর্থ দিয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলেন বলে অভিযোগ করেন শিলা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে শিলা বলেন, তিনি ব্যক্তিগত প্রতিশোধ চান না; বরং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার চান। তাঁর অভিযোগ, এ ঘটনায় তিনি আর্থিক, সামাজিক ও ব্যক্তিগতভাবে চরম সংকটে পড়েছেন। তিনি নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রশাসন, বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা কামনা করেন। পাশাপাশি প্রতারণা ও ধর্ষণের অভিযোগে দোষ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি এবং আইনগত প্রক্রিয়ায় তাঁর অর্থ ফেরত পাওয়ার দাবি জানান।
শিলার ভাষ্য, তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার অভিযোগ প্রকাশ্যে আনার উদ্দেশ্য হলো ন্যায়বিচার পাওয়া এবং অন্য কোনো নারী যেন একই ধরনের প্রতারণা বা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর হোসেন গাজীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “যা করে করুক, তাতে কিছু আসে যায় না।” শিলা আক্তারকে পাল্টা প্রতারক দাবি করে তাঁর একাধিক স্বামী রয়েছে বলে অভিযোগ করেন জাহাঙ্গীর। এ বিষয়ে তাঁর কাছে নথিপত্র রয়েছে দাবি করে তিনি নিজেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান।
তবে জাহাঙ্গীরের পাল্টা অভিযোগের পক্ষে কোনো নথি এ প্রতিবেদনের জন্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে শিলা আক্তারের উত্থাপিত অভিযোগগুলোরও চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়া ও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।
এ ঘটনায় মামলার তদন্তের অগ্রগতি, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কোনো গ্রেপ্তারি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না এবং অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা প্রয়োজন।