মনজুর মোর্শেদ তুহিন (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি: , আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ , আজকের সময় : মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬

পটুয়াখালী মৌজায় ডিজিটাল ভূমি জরিপ উদ্বোধন, ভূমি মালিকদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা

জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ, খতিয়ানে ভুল, জমির পরিমাণে গরমিল কিংবা মালিকানার তথ্য বাদ পড়ার মতো জটিলতা এড়াতে পটুয়াখালী সদর উপজেলার ২৬ নম্বর (এসএ-৩৮ নম্বর) পটুয়াখালী মৌজায় শুরু হয়েছে ডিজিটাল ভূমি জরিপ কার্যক্রম। জমির সঠিক পরিমাপ ও নির্ভুল রেকর্ড তৈরির এ উদ্যোগকে ঘিরে ভূমির মালিকদের সচেতন করতে মাঠপর্যায়ে করণীয় ও সতর্কতামূলক নির্দেশনাও প্রচার করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জরিপের শুরু থেকে খসড়া রেকর্ড যাচাই, আপত্তি-আপিল এবং চূড়ান্ত পর্চা সংগ্রহ—প্রতিটি ধাপে মালিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বেলুন উড়িয়ে এবং ডিজিটাল ভূমি জরিপের যন্ত্র পরিচালনার মাধ্যমে এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট চৌধুরী আশরাফুল করিম। ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের আওতাধীন পটুয়াখালী জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে জেলা পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি সহকারী পুলিশ সুপার মোঃ অপু সরোয়ার, উপ-পরিচালক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ড. মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম, পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাব হোসেন চৌধুরীর প্রতিনিধি অ্যাডভোকেট শরিফ মো. সালাউদ্দিন, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহা. মুজিবুর রহমান, জেলা আনসার কমান্ডেন্ট মোঃ রুবেল হোসাইন, সরকারি কৌশলী (জিপি) মোঃ আব্দুল্লাহ ইউসুফ, সহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

সকাল সাড়ে ৯টা থেকে অতিথিদের অভ্যর্থনা ও আসন গ্রহণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। সকাল ১০টায় পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের পর স্বাগত বক্তব্য দেন পটুয়াখালী জোনের ভারপ্রাপ্ত জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার মো. আল-মুক্তাদির হোসেন। সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে পটুয়াখালী মৌজার ডিজিটাল জরিপ কার্যক্রমের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন সার্ভেয়ার (গ্রেড-১) মো. জাহিদ হোসেন।

সকাল সাড়ে ১০টায় বিশেষ অতিথিদের বক্তব্যের পর সভাপতির বক্তব্য অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১১টা ২৫ মিনিটে প্রধান অতিথির ভাষণ ও উদ্বোধনী ঘোষণা এবং পরে মুক্ত আলোচনা হয়। আনুষ্ঠানিকতা শেষে বেলুন উড়িয়ে ও ডিজিটাল জরিপযন্ত্র পরিচালনার মাধ্যমে কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়।

ডিজিটাল জরিপের নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিস, পটুয়াখালী সদর ভূমির মালিকদের জন্য পর্যায়ভিত্তিক নির্দেশনা প্রচার করেছে। এতে বলা হয়েছে, জরিপ শুরুর বিজ্ঞপ্তি বা ইশতেহার জারির পর প্রত্যেক মালিককে নিজ নিজ জমির সীমানা ও আইল চিহ্নিত করে রাখতে হবে। জরিপকর্মীদের জমিতে প্রবেশ, পরিমাপ এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা করতে হবে।

নকশা প্রস্তুতের সময় জমির সীমানা সঠিকভাবে দেখিয়ে দেওয়া এবং নকশা যথাযথভাবে তৈরি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সীমানাসংক্রান্ত বিরোধ থাকলে আগেই সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। অনুপস্থিত মালিকদের জমির নকশা প্রস্তুতের বিষয়েও পারস্পরিক সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে। ফসলি জমিতে জরিপের সময় যাতে ফসলের ক্ষতি না হয়, সেদিকেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

জমির দাগ নম্বর, মালিকের পূর্ণ ঠিকানা, ডাকঘরের নাম, মোবাইল নম্বর ও জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সঠিকভাবে দিতে হবে। প্রকৃত মালিকের পরিবর্তে বর্গাদার, বন্ধকগ্রহীতা, ভাড়াটিয়া বা পাহারাদারের নাম মালিক হিসেবে রেকর্ডভুক্ত হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। কোনো মালিকের নাম বাদ পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানানোর পাশাপাশি জরিপ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করতে হবে।

মাঠপর্চায় জমির পরিমাণ কম বা বেশি দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে জরিপকর্মীদের জানাতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত বদর ফি জমা দিয়ে পুনরায় জমি মাপার ব্যবস্থা এবং বিরোধ থাকলে ডিসপিউট দাখিল করতে হবে। সরকারি জমি সঠিকভাবে রেকর্ডভুক্ত করতেও সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে।

জরিপের খসড়া প্রকাশনা বা ডিপি পর্যায়ে জমির মালিকদের নিজ নিজ রেকর্ড ও নকশা যাচাই করতে হবে। খতিয়ানে মালিকের নাম, জমির পরিমাণ ও দাগ নম্বর সঠিক আছে কি না এবং খতিয়ানের সঙ্গে নকশার মিল রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা জরুরি। ভুল পাওয়া গেলে নির্ধারিত পদ্ধতিতে আপত্তি দাখিল করে রসিদ সংগ্রহ করতে হবে। আপত্তির আবেদনপত্রে উভয় পক্ষের পূর্ণ ঠিকানা, ডাকঘরের নাম ও মোবাইল নম্বর উল্লেখ করতে হবে।

আপত্তি বা আপিলের শুনানির নোটিশ পেলে নির্ধারিত সময়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ উপস্থিত থাকতে হবে। আপত্তির রায় বা আদেশে সংক্ষুব্ধ হলে সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে মামলার নকল সংগ্রহ করে আপিল করার কথা বলা হয়েছে। আপিল পর্যায়েও প্রতিকার না পেলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

চূড়ান্ত প্রকাশনার সময় নির্ধারিত মূল্যে ভূমির প্রিন্ট পর্চা ও নকশা সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করতে হবে। করণিক ভুল কিংবা প্রতারণামূলকভাবে তথ্য পরিবর্তনের বিষয় ধরা পড়লে সংশোধনের আবেদন করা যাবে। গেজেট বিজ্ঞপ্তির পরও রেকর্ড নিয়ে আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা যাচাই করে আইনানুগ প্রতিকার নিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, জরিপের বিভিন্ন পর্যায়ে মালিকদের সচেতন অংশগ্রহণ ও সঠিক তথ্য সরবরাহ নির্ভুল ভূমি রেকর্ড তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো জমির সীমানা চিহ্নিত করা, নথিপত্র প্রস্তুত রাখা এবং প্রতিটি পর্যায়ে রেকর্ড যাচাই করলে ভবিষ্যতের ভূমিসংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো সহজ হবে।