রাজধানীর বাড্ডা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হানিফের বিরুদ্ধে গভীর রাতে বাসায় অনধিকার প্রবেশ, ভাঙচুর, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুণ্ঠন এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন রাবেয়া আক্তার (৩৫) নামে এক নারী। এ ঘটনায় বাড্ডা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ তুলে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছেও নিরপেক্ষ তদন্ত ও অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন তিনি
গত ১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে ডিএমপি কমিশনার বরাবর দেওয়া লিখিত আবেদনে রাবেয়া আক্তার এসব অভিযোগ করেন। তিনি উত্তর বাড্ডার আলীর মোড় এলাকার একটি বাসায় সাব-লেট হিসেবে ভাড়া থাকেন।
লিখিত অভিযোগে রাবেয়া আক্তার উল্লেখ করেন, গত ২৬ আগস্ট দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টা ৪৫ মিনিটে এসআই হানিফ, মজিরুন নেছা, মো. দিপু, সুমি এবং অজ্ঞাতনামা আরও সাত থেকে আটজন ব্যক্তি সিভিল পোশাকে তাঁর বাসায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। এ সময় বাসার গেট খুলতে সামান্য দেরি হওয়ায় এসআই হানিফ দরজায় একাধিকবার লাথি মারেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এতে বাসার মূল ভাড়াটিয়ার চার, আট ও ১২ বছর বয়সী শিশুরা আতঙ্কিত হয়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠেন বলে উল্লেখ করা হয়।

বেআইনিভাবে তল্লাশীর নামে লুটপাটের স্থির চিত্র।
রাবেয়ার দাবি, পরে ওই ব্যক্তিরা জোরপূর্বক তাঁর কক্ষে প্রবেশ করে আসবাবপত্র ভাঙচুর ও মালামাল তছনছ করেন। এ সময় তাঁর নগদ ছয় হাজার টাকা, আট আনা ওজনের একটি স্বর্ণের চেইন, যার আনুমানিক মূল্য এক লাখ ১৫ হাজার টাকা, এবং একটি ব্লুটুথ স্পিকার নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া এসআই হানিফ তাঁকে যেকোনো সময় যেকোনো মামলায় গ্রেপ্তার করার হুমকি দেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করেন তিনি।

বেআইনিভাবে তল্লাশীর নামে লুটপাটের স্থির চিত্র।
থানায় অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার না পাওয়ার দাবি:
রাবেয়া আক্তারের অভিযোগ, এ ঘটনায় তিনি গত ৫ সেপ্টেম্বর ইং তারিখে বাড্ডা থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও কার্যকর প্রতিকার পাননি। তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই তারেক আজিজ অভিযোগটির যথাযথ তদন্ত না করে বরং তাঁকেই হয়রানি করেছেন।
এ পরিস্থিতিতে তিনি আর্থিক ক্ষতি, মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে জানিয়েছেন।
এসআই হানিফ গংদের বিরুদ্ধে ডিসি (গুলশান) বরাবর অন্য এক নারীর অভিযোগের প্রসঙ্গ:
আবেদনে রাবেয়া আক্তার আরও উল্লেখ করেন, গত ১৫ অক্টোবর এসআই হানিফের বিরুদ্ধে ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনারের (ডিসি) কাছে মোছা. মাজেদা খাতুন (৭৬) নামে আরেক নারী অভিযোগ করেছেন বলে বলে জানা গেছে । ওই অভিযোগে এসআই হানিফের কথিত সহযোগী হিসেবে মজিরুন নেছার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ নিয়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা দাবি:
ডিএমপি কমিশনারের কাছে দেওয়া অভিযোগে তিনি এসআই হানিফ ও এসআই তারেক আজিজের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি অন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ, হয়রানি বন্ধ এবং লুণ্ঠিত টাকা ও মালামাল উদ্ধারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য :
ভুক্তভোগী রাবেয়া আক্তার (নিপা) বলেন, আমার সাথে এসআই হানিফ যে আচরণ করেছেন তা স্পষ্ট আইনের লঙ্ঘন! আমি বাড্ডা থানায় অভিযোগ দিয়ে প্রতিকার না পাওয়ায় ডিএমপি কমিশনার মহোদয় বরাবর অভিযোগ দিয়েছি। এতেও যদি বিচার না পাই তাহলে আমি মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও আইজিপির কাছে যাব। তাতেও প্রতিকার না পেলে মামলা করবো। আমি এসআই হানিফ ও মুজিরুন নেছার কঠিন বিচার চাই।
অপর ভুক্তভোগী দম্পতি শফিকুল ইসলাম ও মাজেদা খাতুন বলেন, এই মুজিরুন নেছা এসআই হানিফের আশকারায় যা ইচ্ছে তাই করতেছে আমার সম্পত্তি লিখে নেয়ার জন্য বিভিন্ন ধরনের হুমকি ধামকী দিচ্ছে। আমাকে কাশিমপুর কারাগারের সামনে মারধর করেছে। আমার সংসারটা তো নষ্ট করছেই এখন আবার বাহিরেও বিভিন্ন মানুষের সাথে এসব করে বেড়াচ্ছে। শুনেছি এসআই হানিফকে নিয়ে গভীর রাতে নিপার বাসায় গিয়েও ঝামেলা করে হুমকি ধামকী দিয়ে এসেছে।
ঘটনাস্থলে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য:
আমেনা বেগম (ফ্ল্যাটের মূল ভাড়াটিয়া ভুক্তভোগী যার সাথে সাব-লেট থাকেন) বলেন, এসআই হানিফ ও তার সাথে থাকা লোকজন রাত সাড়ে ১২ টার পরে অনেকক্ষুন ধরে দরজায় সজোড়ে লাথি দিচ্ছিল ,পরে দরজা খুলার সাথে সাথে কোন পরিচয় না দিয়ে বলতেছে নিপা কে ? নিপা আমার সাথেই দাড়ানো ছিল। এর পরেই হানিফ সাহেব সোজা তার রুমে ঢুকে গেল। আমি রুমে ঢুকতেই শুনতেছি হানিফ নিপাকে হুমকী দিয়ে বলতেছে তুই কালকে সকালের মধ্যে এখান থেকে চলে যাবি না গেলে তোকে নিয়ে গিয়ে রিমান্ডে দিয়ে দিব। তোর মতো মেয়েকে আমি গ্রেফতার করে যে কোন মামলায় ফাঁসিয়ে দিতে পারি। পরে আমি বললাম যে, একটা ভাড়াটিয়া কি এতো কম সময়ের মধ্যে যেতে পারে। আমার বাসায় বা নিপা ম্যাডামের রুমে কেউ আসেনাই আর আসেওনা, এটা বলতেই হানিফ আমাকে বলতেছে আপনি একটা কথা বলবেন না একদম চুপ থাকেন। পরে আমাকে আর নিপাকে রুম থেকে বের করে দিয়ে নিপার ২টা মোবাইল ছিল ২টা মোবাইলই হাত থেকে কেড়ে নিল। পরে সকলকেই রুম থেকে বের করে দিয়ে পুরা রুম তল্লাশী করে সব কিছু উল্টা পাল্টা করে ফেলেছে। আমরা যে কিছু বলবো সেটার কোন সুযোগই দেয় নাই এসআই হানিফ। এসআই হানিফ যা করেছে তা মোটই ঠিক করেনি।
সাইদুল ইসলাম (পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া ও প্রত্যক্ষদর্শী) বলেন, যেহেতু ঘটনাটা আমার পাশের ফ্ল্যাটে তাই চিল্লাচিল্লি শুনে আমি গিয়ে দেখি এসআই হানিফ নিপা ম্যাডামের (রাবেয়া আক্তার) রুমে কিছু একটা খুজতে ছিল এবং রুমটা পুরো এলোমেলো করে ফেলেছে।
মনজু (প্রত্যক্ষদর্শী) বলেন, রাত ১টার সময় আমার ফ্ল্যাটের ল্যান্ড ওউনারের মেয়ে সুমি আমাকে নিপা মিসের (রাবেয়া আক্তার) বাসায় ডেকে নিয়ে গেছে, সেখানে গিয়ে দেখি খুব হট্রগোল চলতেছে, আমি এটা দেখা সবাইকে ধমক দিয়ে চুপ থাকতে বলি। সেখানে সিভিলে একজন সাব-ইন্সপেক্টর ছিল। গিয়ে দেখলাম ওনার ঘরবাড়ি এলোমেলো জামাকাপড় যা আছে সবকিছু ওলট-পালট অবস্থায় রয়েছে। এ ছাড়া নিপা মিসের বাসায় কোন পুরুষ মানুষ পাইনাই বা দেখিনাই।
অভিযুক্তদের বক্তব্য:
অভিযুক্ত সুমি বলেন, সেদিন নিপার বাসায় মাসুদকেসহ হাতেনাতে ধরা হয়েছে। নিপা তো আরো অনেক ছেলেদের সাথে এসব করে বেড়াচ্ছে।সকল প্রত্যক্ষদর্শীরা তো বলছে সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি আপনি বলছেন পাওয়া গেছে আপনার কথা তো মিলছে না! প্রতিবেদক এমন প্রশ্ন করতেই তিনি ফোন বিচ্ছিন্ন করে দেন।
মুজিরুন নেছার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
অভিযুক্ত এসআই তারেক আজিজ বলেন যেহেতু ডিএমপি কমিশনার বরাবর অভিযোগ হয়েছে, কাগজ আসুক আমি লিখিত জবাব দিব।
প্রধান অভিযুক্ত বাড্ডা থানার এসআই হানিফ বলেন, আমার ওই এলাকায় ডিউটি ছিল আমি হৈ-হুল্লোর শুনে সেখানে গিয়েছি। আপনি যা বলছেন তা সত্য নয়। আপনি যা পারেন করেন গিয়ে বলেই ফোন বিচ্ছিন্ন করে দেন।
প্রশাসনিক বক্তব্য :
বাড্ডা থানার অফিসার ইনচার্জ কাজী মো. নাসিরুল আমিন বলেন, আমার জানা নেই। পরবর্তীতে অভিযোগের কপি তার কাছে পাঠালেও তিনি আর কোন সাড়া দেননি।
ডিসি (গুলশান বিভাগ) মোহাম্মদ রুহুল কবির খানের সাথে একাধিক ভুক্তভোগীরা দেখা করলে তিনি প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের আশ্বাস দেন। পরবর্তীতে আবারো যোগাযোগ করা হলে তিনি দেখবেন বলে জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায় উত্তর বাড্ডার আলীরমোরের একটি ডিসের অফিসে হানিফ ও তার সহযোগী মজিরনের নেতৃত্বে তারা একটি ছোট থানা খ্যাত আস্তানা গড়ে তুলেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, সেখানে তারা নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে আর্থিক সুবিধা সহ দেন দরবার করেন। এ ব্যাপারে এলাকার কেউ ভয়ে কিছু বলে না। তারা অনেক কিছু নিজেদের চোখে দেখলেও ভয়ে মুখ খুলতে পারছেন না কারণ হানিফ এতটাই ক্ষমতাশীল তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বললে তাকে সে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেয়। এলাকার জুয়ার আসর, মাদক কারবারি, অবৈধ ডিস ব্যবসার মাসিক মাশোয়ারা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ সবকিছুই চলে হানিফের ছত্রছায়ায়।
এদিকে এসআই হানিফ বিভিন্ন অজ্ঞাত ব্যক্তি দিয়ে নিউজ না করার জন্য প্রতিবেককে হুমকি-ধামকী দেয়ায় প্রাণ নাশের আশঙ্কায় পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন প্রতিবেদক।