দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (পবিপ্রবি) এর নতুন ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর, এন্টোমোলজিস্ট প্রফেসর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান।
সোমবার (৮ জুন) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক প্রজ্ঞাপনে এ নিয়োগের তথ্য জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জারি করা প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন সহকারী সচিব মো. শাহ আলম সিরাজ।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে পবিপ্রবির এন্টোমলজি বিভাগের প্রফেসর ও প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ড. এস. এম. হেমায়েত জাহানকে প্রো-ভিসির পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে ভাইস-চ্যান্সেলর পদে নিয়োগ দেওয়া হল। নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী চার বছর তিনি এ দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি বর্তমান পদের সমপরিমাণ বেতন-ভাতা এবং বিধি অনুযায়ী অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সার্বক্ষণিকভাবে ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। তবে রাষ্ট্রপতি প্রয়োজনবোধে যেকোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন।
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার রামপুর গ্রামের এক শিক্ষানুরাগী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৭৭ সালের ২৮ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন ড. হেমায়েত জাহান।
তাঁর পিতা অ্যাডভোকেট মাওলানা আ.ফ.ম. শাহজাহান ছিলেন একজন আইনজীবী ও সমাজচিন্তক। মা বেগম লতিফা জাহান ছিলেন একজন শিক্ষিকা।
ড. হেমায়েত জাহান উচ্চশিক্ষার জন্য বেছে নেন এন্টোমোলজি বা কীটতত্ত্ব বিষয়কে। পরবর্তীতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিখ্যাত Kyungpook National University থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখানে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি বৈজ্ঞানিক জগতে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন। তাঁর গবেষণাকর্ম কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
২০০৩ সালে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্টোমোলজি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। দুই দশকেরও বেশি সময়ের শিক্ষকতা জীবনে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন এবং শিক্ষার্থীদের কাছে একজন অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্বেও রেখেছেন সফলতার স্বাক্ষর। রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক গতিশীলতা বৃদ্ধি, একাডেমিক কার্যক্রমে গতি আনা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
শিক্ষক রাজনীতিতেও তিনি ছিলেন সক্রিয় ও দায়িত্বশীল। শিক্ষক সমিতি, ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব) এবং বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি শিক্ষকদের অধিকার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থরক্ষায় কাজ করেছেন।
উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো পবিপ্রবিকে একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা। এ বিষয়ে তিনি বলেন, “শুধু ডিগ্রি প্রদান নয়, জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ। আমরা এমন একটি শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে গবেষণা, প্রযুক্তি, নৈতিকতা এবং মানবিক মূল্যবোধ সমানভাবে বিকশিত হবে।”
নতুন ভিসি হিসেবে তাঁর অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে আউটকাম বেইজড এডুকেশন (ওবিই) বাস্তবায়ন, গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ, স্মার্ট ক্যাম্পাস গড়ে তোলা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন উপকূলীয় অঞ্চলভিত্তিক গবেষণা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, ক্লাইমেট-স্মার্ট কৃষি এবং সমুদ্রসম্পদ নিয়ে গবেষণার সম্ভাবনাকে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পবিপ্রবি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানভিত্তিক ভূমিকা পালন করতে পারে।
ড. হেমায়েত জাহান মনে করেন, বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। এজন্য শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইনির্ভর জ্ঞানে সীমাবদ্ধ না থেকে গবেষণা, উদ্ভাবন, নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা দক্ষতায় সমৃদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
