সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পুনর্নির্ধারণ করে জাতীয় বেতন স্কেল (পে-স্কেল)-২০২৬ অনুমোদন করেছে সরকার। নতুন বেতন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে মূল বেতন পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ অনুমোদন দেয়া হয়।
বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রেখে নতুন বেতন স্কেলে সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। নতুন বেতন স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হবে।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন কাঠামো যুগোপযোগী করতে জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫ ও সশস্ত্রবাহিনী বেতন কমিটি-২০২৫-এর প্রতিবেদন পাওয়ার পর সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সচিব কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই নতুন বেতন স্কেল অনুমোদন করা হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত একজন সচিব বলেন, মন্ত্রিসভার বৈঠকে নতুন পে স্কেল অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানাবেন।
জানা গেছে, নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক বেতন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার, সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ অনুযায়ী, ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আর প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ গ্রেডের বেতনের অনুপাতও কমানো হয়েছে। বিদ্যমান ১:১.৯৪৫ অনুপাত কমিয়ে ১:১.৭৮ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ১৪২ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
২০৩০ সালের মধ্যে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’
নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী সরকার সামরিক ও অসামরিক ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ (ওয়ান র্যাংক ওয়ান পেনশন) পদ্ধতি চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এ পদ্ধতি একসঙ্গে বাস্তবায়নে বিপুল আর্থিক সংশ্লেষ এবং ২০১৯ সালের আগে অবসর নেয়া অসামরিক কর্মচারীদের প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় তা পর্যায়ক্রমে ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এর আগে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে অবসরভোগী পেনশনধারীদের নিট পেনশন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী-
* মাসিক ৯ হাজার টাকা বা তার কম নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের পেনশন বাড়বে ১০০ শতাংশ।
* ৯ হাজার ১ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৭৫ শতাংশ।
* ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৬৫ শতাংশ।
* ৩০ হাজার ১ টাকা থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৬০ শতাংশ।
* ৪০ হাজার ১ টাকা বা তার বেশি নিট পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের বাড়বে ৫৫ শতাংশ।
সরকারের মতে, এর ফলে দীর্ঘদিন আগে অবসরে যাওয়া এবং তুলনামূলক কম নিট পেনশন পাওয়া অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন বৃদ্ধির পরিমাণ বেশি হবে।
প্রথমবার প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা
জানা গেছে, নতুন বেতনস্কেলে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন প্রত্যেক সন্তানের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা ভাতা দেয়া হবে।
এছাড়া ডিজিটাল যোগাযোগ ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ব্যয় বিবেচনায় মোবাইল ভাতার আওতাও বাড়ানো হয়েছে। এতদিন কেবল পঞ্চম গ্রেডের কর্মচারীরা মোবাইল ভাতা পেতেন। নতুন বেতন স্কেলে সব গ্রেডের কর্মচারী এ ভাতা পাবেন।
দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন
নতুন বেতন স্কেল এক সঙ্গে কার্যকর না করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর কারণ হিসেবে বেতন স্কেল বাস্তবায়নের আর্থিক সংশ্লেষ এবং মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা বলা হয়েছে।
চলতি ২০২৬-২৭ এবং আগামী ২০২৭-২৮ অর্থবছরে পর্যায়ক্রমে বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে। এ ক্ষেত্রে স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে। বিশেষ করে দশম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
১ জুলাই ২০২৬ থেকে ১ জুলাই ২০২৭-এর মধ্যে মূল বেতন মোট তিনটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। আর বিভিন্ন ভাতা ১ জানুয়ারি ২০২৮ থেকে একযোগে কার্যকর হবে। পেনশনভোগীদের নিট পেনশনও একইভাবে ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে।
এদিকে জুডিসিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস বেতন স্কেল অনুমোদন করা হবে। সেটিও ১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় বেতন স্কেলের মতো ধাপে ধাপে কার্যকর হবে।
সরকার মনে করছে, পর্যায়ক্রমে বেতনস্কেল বাস্তবায়ন করা হলে জাতীয় পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা প্রশমিত করা সম্ভব হবে।
উপকার পাবেন ৩৩ লাখের বেশি মানুষ
নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে প্রায় ২৪ লাখ সামরিক ও অসামরিক কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী ও অন্যান্য যোগ্য সুবিধাভোগী উপকৃত হবেন।
এজন্য সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক আর্থিক ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। সরকারের দাবি, মিডিয়াম টার্ম বাজেট ফ্রেমওয়ার্ক অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট অর্থবছরগুলোর বাজেটে এ ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে।
সরকার মনে করছে, নতুন বেতন স্কেল সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মোদ্দীপনা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ, গতিশীল ও জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬ বাস্তবায়নের জন্য অর্থ বিভাগ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন, আদেশ ও নির্দেশনা জারি করবে। এসব নির্দেশনায় বেতন নির্ধারণ পদ্ধতি, বিভিন্ন ভাতা, পেনশন এবং অবসর-পরবর্তী অন্যান্য সুবিধাসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিস্তারিত বিধান থাকবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদফতর, দফতর ও সংস্থাগুলোকে অনুমোদিত বেতন স্কেল যথাযথভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হবে।