যে মানুষটি একাত্তরে দেশ স্বাধীন করতে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাকেই নিজের বসতভিটায় টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। ভূমিহীন হিসেবে সরকার থেকে পাওয়া তিন শতাংশ জমিতে বসবাস করেও উচ্ছেদের আতঙ্কে দিন কাটছে তাঁর। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পাওয়া সরকারি বীর নিবাসের নির্মাণকাজও বন্ধ হয়ে আছে মাঝপথে। এর মধ্যে পরিবারের ওপর হামলা ও বসবাসের অস্থায়ী ঘর ভাঙচুরের অভিযোগে কার্যত আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে তাঁর পরিবার। প্রশাসনের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও নিরাপত্তা ও স্থায়ী আশ্রয়ের নিশ্চয়তা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ৮০ বছর বয়সে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবেশদ্বারে আমরণ অনশনে বসেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আজহার আলী হাওলাদার। ১ নভেম্বর সকালে শুরু করা এই অনশন থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আজহার আলী হাওলাদার (৮০)। পিতা হোসেন আলী হাওলাদার। মুক্তিযোদ্ধা নম্বর- ৬০৩০১০১৫৬। তাঁর দাবি, তিনি মেজর জলিলের অধীনে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। জন্মস্থান বরিশাল হলেও পটুয়াখালীতে বেড়ে ওঠা এবং এখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ায় তিনি পটুয়াখালী জেলার তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা।
জানা যায়, ২০০৯ সালে পাঁচ শতাংশ জমি বরাদ্দ চেয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পটুয়াখালী সদর উপজেলা ভূমি অফিসে আবেদন করেন আজহার আলী হাওলাদার। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভূমিহীন হিসেবে পটুয়াখালী পৌর শহরের পুরাতন ফেরিঘাট এলাকায় তাঁকে তিন শতাংশ সরকারি জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এরপর থেকে পরিবার নিয়ে ওই জমিতে বসবাস করে আসছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ভূমিহীন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ২০২৪ সালে একই জায়গায় সরকারের পক্ষ থেকে একটি বীর নিবাস বরাদ্দ পান।
জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে ২০২৫ সালে বীর নিবাসের নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিন্তু কাজের অগ্রগতি প্রায় ৪০ শতাংশ হওয়ার পর ২০২৬ সালের মার্চ থেকে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অর্থায়নে শুরু হওয়া এই আবাসন প্রকল্প অসমাপ্ত পড়ে থাকলেও কাজ বন্ধের কারণ কিংবা পুনরায় নির্মাণকাজ শুরুর বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা পাননি বলে অভিযোগ করেছেন মুক্তিযোদ্ধা।
এদিকে বীর নিবাসের কাজ বন্ধ থাকার পাশাপাশি নতুন করে দেখা দিয়েছে বসতভিটা হারানোর শঙ্কা। আজহার আলী হাওলাদারের অভিযোগ, স্থানীয় কতিপয় দুর্বৃত্ত তাঁদের সরকারি বরাদ্দের জমি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা চালাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালানো হয় এবং বসবাসের অস্থায়ী ঘরটি ভেঙে ফেলা হয়। এতে পরিবার নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন তিনি। একদিকে অসমাপ্ত সরকারি ঘর, অন্যদিকে বসবাসের অস্থায়ী আশ্রয়টুকুও হারিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের।
একজন ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধার জন্য সরকারিভাবে জমি বরাদ্দ এবং পরবর্তী সময়ে বীর নিবাস অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে তাঁর আবাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি—এমন অভিযোগে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি জমিতে বসবাসের অধিকার নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হলে প্রশাসনের দায়িত্ব কী ছিল, কেন বীর নিবাসের নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে এবং হামলা ও ঘর ভাঙচুরের অভিযোগের পরও কেন পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে—এসব বিষয় এখন সামনে এসেছে।
আজহার আলী হাওলাদার জানান, পরিবারের ওপর হামলা, অস্থায়ী ঘর ভাঙচুর এবং উচ্ছেদের চেষ্টার বিষয়ে তিনি একাধিকবার জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু বসতভিটায় নিরাপদে বসবাস এবং বীর নিবাসের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার বিষয়ে কোনো কার্যকর নিশ্চয়তা না পাওয়ায় বাধ্য হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে আমরণ অনশনে বসেছেন।
অনশনরত বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ আজহার আলী হাওলাদার বলেন, “আমি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। মেজর জলিলের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। জন্মস্থান বরিশাল হলেও পটুয়াখালীতেই বড় হয়েছি, এখান থেকেই যুদ্ধ করেছি। আমি পটুয়াখালী জেলার তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা। বর্তমানে ৮০ বছর বয়সে এসে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশ সরকার আমাকে বীর নিবাসের একটি ঘর বরাদ্দ দিয়েছিল। ভূমিহীন হওয়ায় সরকার আমাদের সরকারি জায়গায় ঘর দিয়েছে। কিন্তু ঘরটির কাজ অর্ধেক হওয়ার আগেই বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কেন কাজ বন্ধ রয়েছে, তা আমার জানা নেই। অন্যদিকে স্থানীয় দুর্বৃত্তরা আমাকে সরকারি জায়গা থেকে উচ্ছেদের জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। আমার পরিবারের ওপর হামলা চালিয়ে অস্থায়ী ঘরটিও ভেঙে দিয়েছে। বর্তমানে আমি খুবই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি জীবনের শেষ বয়সে এসে পরিবার নিয়ে একটু নিরাপদে থাকতে চাই। সরকারের দেওয়া জমি ও ঘরটুকুর নিশ্চয়তা চাই। জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে একাধিকবার গিয়েও সমাধান পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে আমরণ অনশনে বসেছি। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবেদন, তিনি যেন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন এবং আমার পরিবারের নিরাপত্তা ও বীর নিবাসের নির্মাণকাজ শেষ করার ব্যবস্থা করেন।”
এ অবস্থায় একজন প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধার মানবিক সংকট নিরসনে জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সরকারি বরাদ্দের জমির কাগজপত্র যাচাই করে তাঁর বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করা, পরিবারের ওপর হামলা ও অস্থায়ী ঘর ভাঙচুরের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বীর নিবাসের নির্মাণকাজ কেন বন্ধ রয়েছে, প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্তদের কোনো গাফিলতি আছে কি না এবং অবশিষ্ট কাজ কবে শেষ হবে, তা তদন্ত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে।
সরকারের আবাসন সুবিধা পেয়েও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যদি জীবনের শেষ বয়সে নিরাপদ আশ্রয়ের দাবিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অনশনে বসতে হয়, তবে তা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগ নয়; সরকারি সহায়তা বাস্তবায়ন ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আবু মুছা বলেন, মুক্তিযোদ্ধা আজহার হাওলাদারের জন্য বরাদ্দকৃত বীর নিবাসটির জমির মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। নতুন ভাবে তাকে জমি বন্দোবস্ত দিয়ে বীর নিবাস তৈরির কথা ভাবছি। আগেই তাকে আমরা বলেছিলাম নতুন করে জমি বন্দোবস্ত পাওয়ার আবেদন করতে কিন্তু তিনি তা এখনো করেননি।