বাতাসে উৎকট গন্ধ। যতদূর চোখ যায়, ধূসর বর্জ্যের পাহাড়। যুদ্ধক্ষেত্র নয়, এটি ঢাকা দক্ষিণ সিটির বর্জ্যের শেষ গন্তব্য মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল। দৈনিক এই পাহাড়ে কয়েক হাজার টন বর্জ্য জমা হয়। এই প্রকল্পে রয়েছে মোটা অংকের বাৎসরিক ব্যয়। গল্পটা যখন টাকার অঙ্কে তখন যে কেউ আঁতকে উঠতে বাধ্য। কয়েক হাজার টন বর্জ্য সামলাতে এই ল্যান্ডফিলের পেছনে বাৎসরিক ব্যয় শত কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের পরও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কতটুকু কাজে আসছে- তা নিয়ে প্রশ্ন নগরবাসীর।
তথ্য বলছে, মাতুয়াইলের এই পাহাড় দৈনিক ৩ থেকে ৪ হাজার টন বর্জ্য জমা হতে হতে প্রায় ১০০ ফুট উঁচুতে গিয়ে ঠেকেছে। এই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বছরে বরাদ্দ কোটি টাকা। ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন কিংবা রিসাইক্লিংয়ের আধুনিক স্বপ্ন গল্পের মতো। কিন্তু সরেজমিনে দেখা গেল এক ভিন্ন বাস্তবতা। এখানে ময়লা মানেই বাণিজ্য, আর বাণিজ্য মানেই হাজার কোটি টাকার খেলা। টাইমস টুডের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। ব্যয়ের হিসাব বলছে, অব্যবস্থাপনার বর্জ্য পরিবহনের জ্বালানি তেল, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ সিটি কর্পোরেশনের বিশাল অংকের টাকা খরচ হচ্ছে।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বর্জ্য সংগ্রহের জন্য বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকা। আধুনিক প্রযুক্তির অভাব ও দুর্নীতির কারণে এই বিপুল অংকের টাকা মূলত চলে যাচ্ছে ‘পাহাড় সমান’ ময়লার নিচে। মাতুয়াইলের এই বিষাক্ত নির্যাস আশপাশের খাল আর মাটির নিচে মিশে যাচ্ছে।
স্থানীয়রা বলছেন, টাকা তো খরচ হচ্ছে ঠিকই, জীবন তো বিষাক্ত হয়ে গেল। মাটির নিচের পানি এখন পান করার অযোগ্য, আর বাতাসের গন্ধে টিকে থাকা দায়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাৎসরিক ব্যয় বাড়লেও আধুনিক ‘স্যানিটারি ল্যান্ডফিল’ করার পরিকল্পনা বছরের পর বছর পিছিয়ে যাচ্ছে, তার উত্তর নেই কারও কাছে। মাতুয়াইল এখন তার ধারণক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। অথচ সেখানে এখনও ময়লা ফেলা হচ্ছে নিয়ম ভেঙে। এদিকে নতুন ল্যান্ডফিলের জন্য হাজার কোটি টাকার নতুন প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। জনগণের ট্যাক্সের এই বিশাল অর্থ কি তবে কেবল ময়লার স্তূপ বাড়াতেই ব্যয় হবে? নাকি আধুনিক কোনো সমাধান আসবে।
গত এক দশকে ডিএসসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই খাতে রেকর্ড বরাদ্দ ছিল। প্রায় ৪৩৬.৩০ কোটি টাকা। অথচ আগের বছর বরাদ্দ ছিল মাত্র ৩০ কোটি টাকা! বছরের ব্যবধানে এই বিপুল বরাদ্দে সে সময় সংস্থার ভেতরেই নানা গুঞ্জন উঠেছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের নতুন বাজেটেও বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই পাহাড়সম টাকার সুফল কেন পায় না নগরবাসী?
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মাতুয়াইল গেটে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে জাপানি প্রযুক্তির আধুনিক কমপ্যাক্টর আর ডাম্প ট্রাক। জাইকার সহায়তায় আনা এসব গাড়ি চকচক করছে। তবে এর ভেতরে রয়েছে ‘শুভঙ্করের ফাঁকি’। কোটি কোটি টাকার গাড়ি কেনা হলেও এবার কমানো হয়েছে জ্বালানি তেলের বরাদ্দ। রাজকীয় সব গাড়ি গ্যারেজেই বেশি সময় পড়ে থাকে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিএসসিসির কাছে এখন ময়লা আর কোনো আপদ নয়, বরং বড় আয়ের উৎস। কেবল ডাম্পিং সাইট ইজারা দিয়েই এবার ৩০ কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। পশুর হাট থেকে পকেটে ঢুকবে ২৬ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই বাণিজ্যিকীকরণের কারণে সেবার মান একেবারে তলানিতে ঠেকেছে।
তথ্য বলছে, মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলের দৈনিক পরিচালন ব্যয় প্রায় ২ লাখ টাকা। প্রতি টন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সিটি কর্পোরেশন খরচ করছে ৪২৬ টাকা। হিসেব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন এই ময়লার পাহাড় সামলাতে রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে খরচ হচ্ছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। তবে, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া না থাকায় এই বিপুল অংকের খরচ দীর্ঘস্থায়ী সমাধান না।
ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণ ও স্যানিটারি ব্যবস্থার উন্নয়নের নামে প্রায় ১ হাজার ১১২ কোটি টাকার একটি বিশাল প্রকল্পে দিনরাত মিলিয়ে কাজ করছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ল্যান্ডফিলের ভেতরে সরাসরি কাজ করেন ১৫০ থেকে ২০০ জন কর্মী, শহরের বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিবহন মিলিয়ে এক বিশাল জনশক্তি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত।
হাড়ভাঙা খাটুনি আর স্বাস্থ্যের চরম ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা এই পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পেছনে দৈনিক গড়ে ৪৭৫ টাকা মজুরি বরাদ্দ। বিশাল বাহিনীর বেতন ও ভাতার পেছনে বছরে ব্যয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা। অথচ বিপুল বিনিয়োগের পরও মাতুয়াইল ল্যান্ডফিল ধারণক্ষমতা হারিয়ে মরণব্যাধি ছড়াচ্ছে। বাৎসরিক প্রায় ৫৭০ কোটি টাকার সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাজেটের একটি বড় অংশ এই মাতুয়াইলকে কেন্দ্র করে খরচ হয়। আধুনিক রিসাইক্লিং বা বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাগুলো জটিলতায় আটকে আছে। ফলে মাতুয়াইল এখন কেবল একটি বর্জ্য ফেলার স্থান নয়, বরং তা হয়ে উঠেছে জনস্বাস্থ্যের হুমকি। টাকার অঙ্ক বছর বছর বাড়লেও নাগরিক সেবার মান বাড়ছে না, উল্টো বাতাসের উৎকট গন্ধ আর বিষাক্ত বর্জ্য প্রতিদিন ঢাকার জনজীবনকে আরও বিষিয়ে তুলছে।
এদিকে, ২০৩২ সালের মধ্যে রাজধানী ঢাকাকে ‘ক্লিন ঢাকা মাস্টার প্ল্যান’ হাতে নিয়েছে সংস্থাটি। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সাথে বৈঠকও হয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। কিন্তু বর্তমানে প্রতিদিনের ৩ হাজার ২৪ মেট্রিক টন বর্জ্য সামাল দিতেই হিমশিম দশা। ল্যান্ডফিলের আশপাশের বাসিন্দাদের চোখে কেবল দীর্ঘশ্বাস। তাদের অভিযোগ, আবাসন প্রকল্পের নামে ক্লিনার কলোনি নির্মাণের কথা থাকলেও সেটি এখনও ধীরগতিতে চলছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকা শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল সংকট হলো- আমরা এখনো ‘ডাম্পিং’ বা ময়লা ফেলার মানসিকতা থেকে বের হতে পারিনি। সিটি কর্পোরেশন শত শত কোটি টাকা খরচ করে দামি দামি গাড়ি কিনছে, সেই গাড়ির তেল বা রক্ষণাবেক্ষণের সঠিক তদারকি নেই। মাতুয়াইলের মতো ল্যান্ডফিলগুলোতে বারবার জমি বাড়িয়ে সংকটের সমাধান হবে না।
তিনি মনে করেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতের বিশাল বাজেটের একটি বড় অংশ অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হলেও সেবার মানে তার প্রতিফলন কম। ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। বাসা-বাড়িতেই যদি পচনশীল এবং অপচনশীল বর্জ্য আলাদা না করা হয়, তবে ল্যান্ডফিলের ওপর চাপ কমানো অসম্ভব। আধুনিক যন্ত্রপাতির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক ব্যবস্থাপনা, বলেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।
তিনি বর্জ্যকে ‘বর্জ্য’ না ভেবে ‘সম্পদ’ হিসেবে দেখার পরামর্শ দেন। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ বা সার উৎপাদন প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত, যাতে ল্যান্ডফিলের ওপর নির্ভরতা কমে আসে। দামি জাপানি গাড়ি কিনেও যদি তেলের অভাবে ময়লা সংগ্রহ বন্ধ থাকে, তবে সেই বিনিয়োগকে তিনি ‘পরিকল্পনাহীন ব্যয়’ হিসেবে গণ্য করেন।
এ ছাড়া কেবল কাগুজে বাজেট আর দামি যন্ত্রপাতি দিয়ে শহর পরিষ্কার সম্ভব নয়। দরকার স্বচ্ছতা ও সঠিক তদারকি। তেলের বাজেট কমিয়ে আধুনিক গাড়ি বসিয়ে রাখা আর হাজার কোটির ‘ময়লা বাণিজ্য’ চালিয়ে যাওয়ার এই সংস্কৃতি বন্ধ না হলে, পরিচ্ছন্ন ঢাকার স্বপ্ন মাতুয়াইলের বর্জ্যের নিচেই চাপা পড়ে থাকবে চিরকাল, বলেন ড. আদিল মুহাম্মদ খান।
তবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও মাতুয়াইল স্যানিটারি ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণ প্রকল্পের পরিচালক ড. মোহাম্মদ শফিউল্লাহ সিদ্দিক ভূঁইয়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন নিয়ে বেশ আশাবাদী।
তিনি বলেন, বারবার জমি অধিগ্রহণ করে ময়লা ফেলার দিন শেষ হয়ে এসেছে। এখন ময়লা ফেলার জায়গা (ল্যান্ডফিল) বাড়ানোর চেয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বেশি জরুরি। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বা ‘ওয়েস্ট-টু-এনার্জি’ প্রকল্পের ওপর জোর দিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। ল্যান্ডফিল থেকে নির্গত ক্ষতিকারক মিথেন গ্যাস নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ দূষণ রোধে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পক্ষে তিনি।
ড. শফিউল্লাহ আরও বলেন, কোরীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে ডিএসসিসি চুক্তি করেছে। লক্ষ্য হলো- প্রতিদিনের ৩২০০-৩৫০০ টন বর্জ্যকে পুড়িয়ে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সার উৎপাদন করা।
সূত্র: TTT