বরিশাল বিভাগের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) নিলুফার ইয়াসমিনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার ব্যাপক অপব্যবহার, সীমাহীন আর্থিক অনিয়ম, ঘুষ গ্রহণ, বদলি বাণিজ্য ও চরম স্বেচ্ছাচারিতার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের আমল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও অদৃশ্য ক্ষমতার দাপটে তিনি কার্যালয়টিকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। তাঁর ধারাবাহিক নিপীড়ন ও হয়রানিতে পুরো বিভাগের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
মাগুরা-২ আসনের সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবু আব্দুল্লাহেল কাফীর স্ত্রী নিলুফার ইয়াসমিন ২০২২ সালের আগস্টে প্রভাব খাটিয়ে বরিশালের ডিডি পদে পদায়ন নেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠলে গত ২ অক্টোবর তাঁকে অধিদপ্তরে বদলি করে মন্ত্রণালয় প্রজ্ঞাপন জারি করে। এমনকি ৯ অক্টোবর তাঁকে রিলিজ আদেশও দেওয়া হয়। তবে অদৃশ্য শক্তির বলে বদলির আদেশ বাতিল করিয়ে তিনি স্বপদে বহাল থেকে যান, যা সাধারণ শিক্ষক ও কর্মচারীদের চরমভাবে হতাশ করেছে।
গেস্ট হাউস দখল: গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বিভাগীয় অফিসের ৩য় তলার গেস্ট হাউসে পুরো পরিবার নিয়ে বেআইনিভাবে বসবাস করছেন তিনি। মিটিং রুম থেকে দুটি এসি খুলে নিজের ঘরে লাগিয়েছেন এবং বিপুল বিদ্যুৎ বিল সরকারি খাত থেকে পরিশোধ করাচ্ছেন। এতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা কর্মকর্তারা বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে বাইরের হোটেলে থাকছেন।
অফিস সময়সূচিতে বিশৃঙ্খলা: দুপুর ১২টায় অফিসে এসে ১টায় আবার বাসায় যান। বিকেলে এসে রাত ৭-৮টা পর্যন্ত অফিসে সময় কাটান। এর ফলে সেবানির্দেশনায় আসা শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে হয়রানির শিকার হতে হয়।
ভুয়া বিল-ভাউচার: ২০২২-২৩ অর্থবছরের আনুষঙ্গিক বরাদ্দ ও রুটিন মেইনটেন্যান্সের ৫০ হাজার টাকার কাজ না করেই ভুয়া বিলের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়েছে।
ভেন্যু ও টিএ বিল আত্মসাত: সব প্রশিক্ষণ পিটিআই-তে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অনুষ্ঠিত হলেও ভেন্যু ভাড়ার টাকা আত্মসাত করা হয়েছে। এমনকি শিক্ষা পদক ও খেলাধুলার বরাদ্দকৃত টাকা খরচ না করে সনদপত্র পিসি থেকে প্রিন্ট করে দায় সেরেছেন। নিজে ঢাকায় উপস্থিত না থেকেও টিএ/ডিএ বিল উত্তোলন করেছেন।
গাড়ির অপব্যবহার: সরকারি গাড়িটি প্রতিদিন ৬-৮ বার তাঁর সন্তানদের স্কুল ও কোচিংয়ে আনা-নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। অন্য জেলা পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় অফিসের গাড়ি ব্যবহার করলেও সরকারি জ্বালানি তেল তুলে পুরো টাকা পকেটে ভরেন।
কর্মচারীদের গৃহপরিচারক বানানো: অফিসের দুইজন অফিস সহায়ক, নৈশপ্রহরী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ড্রাইভারকে ব্যক্তিগত কাজে খাটান। পরিচ্ছন্নতাকর্মী আকলিমা বেগমকে দিয়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘরের কাজ করানোর কারণে অফিসের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কাজে বাধ্য করা: স্কুলের সময় চলাকালীন স্থানীয় কিশোর মজলিশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. আল মামুনকে নিজের ছেলেকে প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য করেছেন।
শাহ আলম সিন্ডিকেট: অফিস সহকারী শাহ আলমের মাধ্যমে বদলির ভয় দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ঘুষ আদায় করা হয়। জিপিএফ ঋণ, এনওসি, ল্যাম্পগ্রান্ট বা উচ্চতর স্কেলের ফাইলেও টাকা ছাড়া স্বাক্ষর মেলে না।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর অবৈধ ব্যবহার: সাবেক সাঁটলিপিকার আরিফ হোসেন অবসর নিলেও গোপন নথি তাঁর কাছে রেখে শাহ আলমের মাধ্যমে অবৈধ লেনদেনের জন্য তাঁকে অফিসে ব্যবহার করা হচ্ছে।
শোকজ ও এসিআর-এর ভয় দেখানো: অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে গেলেই শোকজ, বিভাগীয় মামলা ও এসিআর (ACR) খারাপ দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
কোচিং ও ডেপুটেশন বাণিজ্য: মন্ত্রণালয়ের নিয়ম তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার বলে প্রাইভেট কোচিংয়ে উৎসাহ দান এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পছন্দের জায়গায় শিক্ষকদের ডেপুটেশনে বদলির পাঁয়তারা চালাচ্ছেন তিনি।
অধ্যক্ষ, শিক্ষক ও কর্মচারীদের একাংশ ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, পটপরিবর্তনের পর তারা দুর্নীতামুক্ত পরিবেশের স্বপ্ন দেখলেও ‘দস্যু রানী’ নিলুফারের কারণে তা অধরাই রয়ে গেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, বরিশাল প্রাথমিকে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে অনতিবিলম্বে এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ ব্যাপারে জানতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিবকে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এ বিষয়ে বরিশাল বিভাগীয় অফিসের ডিডি নিলুফার ইয়াসমিনকে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।