শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৩৮ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
আমতলীতে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে বিএনপির বর্ণাঢ্য র‌্যালি ও সমাবেশ আবু নাছের রায়হানের বদলির আদেশে কাঁঠালিয়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, প্রত্যাহারের দাবি সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ বাংলাদেশি নিহত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান-খালেদা জিয়ার সমাধিতে রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা সার্বভৌমত্ববিরোধী ষড়যন্ত্রের বিষদাঁত ভেঙে দিতে হবে: প্রধানমন্ত্রী মোরেলগঞ্জে বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে প্রীতি ফুটবল ম্যাচ অনুষ্ঠিত ঢাকায় আজ যেসব কর্মসূচি রয়েছে বিএনপির শোভাযাত্রা যেসব সড়কে, অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী বেতাগীতে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত মোরেলগঞ্জে বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা

কাস্টমসের সিপাই থেকে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা: নয়নের শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের সন্ধান

নিজস্ব প্রতিনিধি:
  • আপলোডের সময় : শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৫৮১৭ বার পঠিত

রাজস্ব কর্মকর্তা নয়নের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে শত কোটি টাকার সম্পদ বানানোর অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরে সাধারণ সিপাই পদে যোগদান করেছিলেন মোঃ সারওয়ার হোসেন নয়ন। সময়টা ছিল স্বৈরাচারী সরকারের আমল। সরকারি চাকরির ন্যূনতম স্তর থেকে শুরু করা এই ব্যক্তি বর্তমানে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা। পদোন্নতি পেয়েছেন ২০২৫ সালের ৫ মার্চ। কর্মরত আছেন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পশ্চিম)-এ। তার রয়েছে নামে-বেনামে শত কোটি টাকার সম্পদ, বিপুল জমি, বহুতল ভবন, ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী গড়ে তোলার অভিযোগ এখন জাতীয়ভাবে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানা যায়, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইতোমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করছেন, তিনি ভয়-ভীতি প্রদর্শন, জমি দখল, কৃষকদের দলিল আটকে রাখা, ব্যাংক চেক জিম্মি করা এবং চোরাচালানের মাধ্যমে অবৈধভাবে এ সব সম্পদ গড়েছেন।

চাকরির শুরুতে একজন সাধারণ সিপাই হিসেবে যোগদান করেছিলেন সারওয়ার হোসেন। বিমানবন্দর এলাকায় দায়িত্বপালনের সুবাদে তিনি ধীরে ধীরে স্বর্ণ ও বিদেশি পণ্য চোরাচালান চক্রের সঙ্গে যুক্ত হন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে আন্ডারওয়ার্ল্ড ধাঁচে তৈরি হয় তার প্রভাব বিস্তার। পরে পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হলেও তার আর্থিক জীবনধারা সরকারি বেতনের সীমা ছাড়িয়ে যায় বহুদূর। ঢাকায় বিলাসবহুল জীবনযাপন, ব্যয়বহুল গাড়ি, জমি ও ফ্ল্যাট কেনা, ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার লেনদেন এবং স্থানীয়ভাবে লাঠিয়াল বাহিনী গঠন, সবই তার বেআইনি সম্পদের পরিচায়ক।

নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার মনিয়ারী ও বিশা ইউনিয়নের বিভিন্ন মৌজায় তিনি জমির মালিকানা নিয়েছেন— ১. দমদত্তবাড়িয়া মৌজায় ৪৫ বিঘা জমি। ২. হিঙ্গুলকান্দি মৌজায় ১৫ বিঘা জমি। ৩. বাহাদুরপুর মৌজায় ১৮ বিঘা জমি। ৪. তেজনন্দী মৌজায় ২৫ বিঘা জমি। ৫. লালপাড়া মৌজায় ১৭ বিঘা জমি।

সব মিলিয়ে অন্তত ১২০ বিঘা জমি তার নামে-বেনামে রয়েছে। স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, মাত্র ১ লক্ষ টাকা দিয়ে দলিল আটকে রাখা, ৫টি করে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করানো এবং ফাঁকা ব্যাংক চেক নেওয়া ছিল তার প্রধান কৌশল। পরে সুযোগ বুঝে অল্প টাকায় জমি ক্রয় দেখিয়ে প্রভাব খাটিয়ে দখল নিতেন। গ্রামের মানুষদের অভিযোগ, নয়নের কারণে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কেউ দাদার সম্পত্তি হারিয়েছেন, কেউ আবার বসতভিটার ওপরও অনিশ্চয়তায় আছেন। দলিল জিম্মি থাকায় ব্যাংক ঋণ বা সরকারি সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে।

এক প্রবীণ আব্দুর রহমান বলেন, “নয়ন এখন গ্রামের জন্য আতঙ্ক। তার বাহিনী নিয়ে সে ঘুরে বেড়ায়, ভয় দেখায়। টাকা আর প্রভাবের জোরে সে যা চায় তাই করে।” অন্য এক ভুক্তভোগী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের জমির দলিল ও চেক তার কাছে জিম্মি আছে। ভয়ে মুখ খুলি না। প্রতিদিন বড় গাড়ি নিয়ে আসে, টাকা বিলায়, সবাই চুপ হয়ে যায়।”

সারওয়ার হোসেন নিজের অবৈধ সম্পদ গোপন করতে পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করেছেন। তার বাবা আজিম উদ্দিন সোনার, ভাই আনোয়ার হোসেন (সেন্টু), মিজানুর রহমান (মিন্টু) ও আবুল কালাম আজাদের নামে একাধিক জমি ক্রয় করা হয়েছে। এছাড়া চাচাদের জমি নামজারি ছাড়াই দখল করে রেখেছেন। ফলে প্রকৃত মালিকরা তাদের নিজস্ব জমি ব্যবহার করতে পারছেন না। আদালতে মামলা হলেও প্রভাব খাটিয়ে তিনি অনেক ক্ষেত্রেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করছেন।

আত্রাই উপজেলার সমসপাড়া বাজারের বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক শাখায় তার নামে সর্বোচ্চ লেনদেন হয়। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা জমা দেওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতেও কৃত্রিম প্রভাব তৈরি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে গড়ে তোলা “নয়ন বাহিনী” গ্রামের মানুষদের কাছে এক আতঙ্কের নাম। এই বাহিনী কারও বিরোধিতা সহ্য করে না। ভুক্তভোগীরা বলেন, ভয়-ভীতি দেখিয়ে তারা মানুষকে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করে। ফলে গ্রামাঞ্চলের সাধারণ কৃষকরা একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

দুদক সূত্র জানায়, নয়নের বিরুদ্ধে তদন্তে তার আয়-ব্যয়ের অসামঞ্জস্য ধরা পড়েছে। জমি কেনা, ব্যাংক লেনদেন ও বহুতল ভবনের কাগজপত্র মিলিয়ে প্রমাণ মিলেছে বিপুল অবৈধ সম্পদের। দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তার বিরুদ্ধে মামলার মতো পর্যাপ্ত তথ্য রয়েছে। তদন্ত শেষে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার রুবিনা সুলতানা বলেন, একজন সরকারি কর্মচারী নামে-বেনামে শত কোটি টাকার সম্পদ দুর্নীতি ছাড়া সম্ভব নয়। দুদকের উচিত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। সামাজিক বিশ্লেষক ড. সাইফুল হক বলেন, গ্রামীণ কৃষি জমি দখল করে প্রভাবশালী শ্রেণি ধনী হচ্ছে। সাধারণ মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। নয়নের ঘটনা সেই প্রবণতার প্রতিফলন।

কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, সরকারি দায়িত্বে থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন চরম দুর্নীতি। তার লেনদেন ও সম্পদের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে দুদকের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে নয়নের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে, মানুষ তার নাম শুনলেই চুপ হয়ে যায়। ভয়ে অনেকে কথা বলতে চান না। জমি হারানো কৃষকরা নিঃস্ব হয়ে জীবিকার লড়াই করছেন। কেউ ভিটেমাটি রক্ষার সংগ্রামে আছেন, কেউ আবার আইনের আশ্রয় নিয়েও আশাহত।

সারওয়ার হোসেন (নয়ন)-এর গল্প কেবল একজন দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মচারীর কাহিনী নয়, বরং বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে প্রভাবশালীদের দাপট ও সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি। চাকরির সীমিত বেতন থেকে শত কোটি টাকার সম্পদ—এ এক নগ্ন উদাহরণ দুর্নীতি, চোরাচালান, জমি দখল ও ক্ষমতার অপব্যবহারের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুদকের সক্রিয় পদক্ষেপ, প্রশাসনিক তদারকি এবং জনগণের ঐক্য ছাড়া এ ধরনের প্রভাবশালীদের লাগাম টানা সম্ভব নয়।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..