দেশের সরকারি ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদফতর এখন এক বিতর্কিত কর্মকর্তার একক ইশারায় চলছে। সংস্থাটির শীর্ষ পদ, অর্থাৎ প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ার বদলের পর থেকেই নানা আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো সময়জুড়ে যারাই এই পদে এসেছেন, তারাই এটিকে নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করে আঁকড়ে ধরে রাখতে চেয়েছেন। কিন্তু ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এলে এই সংস্থায় অনিয়মের সুযোগ আরও বেড়ে যায়। চতুর ও সুবিধাভোগী কিছু কর্মকর্তা এই সুযোগের পুরো ফায়দা তোলেন। দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের এই সময়ে গণপূর্ত অধিদফতরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে চলতি (রুটিন) দায়িত্বে আসেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। আর তিনি দায়িত্বে বসার পর থেকেই শুরু হয় নজিরবিহীন বদলি বাণিজ্য।
তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ শামীম আখতারকে সরিয়ে দেওয়া হয়। রুটিন দায়িত্ব দেওয়া হয় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে। অথচ অধিদফতরে তার চেয়ে সিনিয়র (জ্যেষ্ঠ) ও যোগ্য অন্তত পাঁচজন কর্মকর্তা ছিলেন। তাদের সবাইকে ডিঙিয়ে খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে লোভনীয় এই চেয়ারে বসানো হয়। এই নিয়মবহির্ভূত পদায়নের পর থেকেই সাধারণ প্রকৌশলীদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় জালিয়াতির অভিযোগটি হলো তার ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি। সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় উচ্চতর শিক্ষার কথা বলে তিনি বছরের পর বছর বিদেশে কাটান। পরবর্তীতে তদন্তে প্রমাণিত হয় যে, তার সেই পিএইচডি ডিগ্রির সনদটি সম্পূর্ণ ভুয়া ছিল। এই জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ার পরও সাবেক পূর্তসচিব শহীদ উল্লা খন্দকারসহ এক প্রভাবশালী মহলের তদবিরের জোরে তিনি চাকরিচ্যুত হওয়া থেকে বেঁচে যান। বড় কোনো শাস্তি না দিয়ে নামমাত্র ১ বছরের জন্য তার বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) স্থগিত রাখা হয়েছিল। অপরাধের তুলনায় এই শাস্তিকে আইনি প্রহসন ও ‘লঘুদণ্ড’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন গণপূর্তের সৎ কর্মকর্তারা।
রূপপুরের সিন্ডিকেট ও বেইলি রোডের ৪৬ লাশ
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির সিন্ডিকেট গড়ার অভিযোগ বেশ পুরোনো। এর আগে পাবনা গণপূর্ত বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য ‘গ্রিন সিটি’ আবাসন তৈরি করা হয়। সেই আবাসন নির্মাণের শতকোটি টাকার ঠিকাদারি ও টেন্ডার নিজের পছন্দের সিন্ডিকেটকে পাইয়ে দেওয়ার মূল কারিগর ছিলেন তিনি। এ ছাড়া, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে রাজধানীর বেইলি রোডের ৭ তলা বাণিজ্যিক ভবন ‘গ্রিন কোজি কটেজ’-এর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার দায়ও তার ঘাড়ে রয়েছে। ওই আগুনে পুড়ে ৪৬ জন মানুষ মারা যান এবং অনেকে দগ্ধ হন। দুর্ঘটনার পর তদন্তে দেখা যায়, ভবনটির নকশায় অগ্নিনিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থাই ছিল না। আর ২০১১ সালে রাজউকের অথরাইজড অফিসার (অনুমোদনকারী কর্মকর্তা) থাকাকালীন এই ত্রুটিপূর্ণ ভবনের নকশা পাস করিয়ে দিয়েছিলেন খোদ প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। এই নিয়ে তখন অনেক তোলপাড় হলেও দেশের একটি প্রভাবশালী আবাসন (রিয়েল এস্টেট) কোম্পানির সহায়তায় তৎকালীন আওয়ামী সরকারের একটি চ্যারিটেবল প্রজেক্টে মোটা অঙ্কের টাকা অনুদান দিয়ে ৪৬টি প্রাণের দায় থেকে পার পেয়ে যান তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র কয়েকদিনের মাথায় ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর এবং ১৭-১৮ নভেম্বর পৃথক আদেশে নির্বাহী প্রকৌশলী, উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ও সহকারী প্রকৌশলী পর্যায়ের প্রায় শতাধিক কর্মকর্তাকে একযোগে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগে বদলি করা হয়েছে। অনেক জুনিয়র বা বিতর্কিত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ জেলা বা বিভাগে পোস্টিং দেওয়া হয়েছে, যাকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন কোটি টাকার ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বা পুরস্কার হিসেবে ভালো পদে বসানো। অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই উদ্দেশ্যমূলক বদলির কারণে পুরো দপ্তরের কর্মকর্তারা এখন তিনটি আলাদা দলে ভাগ হয়ে গেছেন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বদলি হওয়া ৬৫ জন কর্মকর্তার তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে- এই চেয়ারগুলোতে বসানোর নাম করে কর্মকর্তাদের কাছ থেকে ১০ লাখ থেকে শুরু করে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে খালেকুজ্জামান চৌধুরী ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসায় অন্তর্বর্তীকালীন পরিস্থিতিতে, তড়িঘড়ি করে শতকোটি টাকার এই বদলি বাণিজ্য করা হয়। মন্ত্রণালয় উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করলে, এই সিন্ডিকেটের আসল রূপ ও লেনদেনের গোপন তথ্য বেরিয়ে আসবে বলছেন দফতরের একাধিক প্রকৌশলী।
এই প্রাইজ পোস্টিংয়ের মাধ্যমে সুবিধা পাওয়া যেসকল নির্বাহী প্রকৌশলীদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তারা হলেন- সৈয়দ ইসকান্দার আলী, জুবায়ের বিন হায়দার, নাজমুল আলম রব্বানী, শরিফুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, মোহাম্মদ তরিকুল আলম, রুবাইয়াত ইসলাম, আজমুল হক, মিজানুর রহমান, জাহিদুল ইসলাম খান, এ.কে.এম তানভীর আহমেদ এবং মোহাম্মদ ফতেহ আজম খান। তবে প্রকৌশলীদের দাবি, তারা এমন কিছু করেননি।
এদিকে, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনে নিজের চেয়ার বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী। যেকোনো উপায়ে এই শীর্ষ পদে টিকে থাকতে এই সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের দফতরে তিনি নিয়মিত যাতায়াত ও তদবির চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি। এমনকি তার ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে অভিযোগের বিষয়গুলো লিখে মেসেজ পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।