দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোকে অতিরিক্ত ওজনের ভারী ট্রাকের থাবা থেকে বাঁচাতে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। কথা ছিল, মহাসড়কের উৎসমুখেই বসবে অত্যাধুনিক স্কেল, যার মাধ্যমে চলন্ত অবস্থাতেই মাপা হবে পণ্যবাহী যানের ওজন। কিন্তু যে মেগা প্রকল্প মহাসড়ক বাঁচাবে, তার নিজের অবস্থাই এখন করুণ!
প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেলেও ১৬০৯ কোটি টাকার এই প্রকল্পটি এখন নিজেই যেন ‘লাইফ সাপোর্টে’ ধুঁকছে। টাইমস টুডের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সড়ক পরিবহণ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদফতরের এই প্রকল্পের নথিপত্র এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়ের চেয়ে চার বছর বেশি সময় পার হলেও মূল কাজই এখনো অন্ধকারে। ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তব অগ্রগতি মাত্র ৫৮ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ২৮ শতাংশ।
তথ্য বলছে, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে সওজ-এর এই মেগা প্রকল্পের নাম গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে পণ্য পরিবহনের উৎসমুখে এক্সেল লোড নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র স্থাপন। ১৬০৯ কোটি টাকা বাজেটের এই প্রকল্পটি ২০১৯ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়। ২০২২ সালের জুনে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, ব্যর্থতার দায়ে দুই দফায় ব্যয় বৃদ্ধি ছাড়াই মেয়াদ বাড়িয়ে এ বছর জুন পর্যন্ত টেনে আনা হয়েছে।
কেনা হয়নি প্রকল্পের ‘প্রাণ’
পুরো প্রকল্পের মূল ভিত্তি বা প্রাণ হলো ওয়ে ইন মোশন স্কেল। চলন্ত অবস্থায় ট্রাকের ওজন মাপার এই অত্যাধুনিক যন্ত্র কেনার জন্যই মেগা এই বরাদ্দ। অথচ সাত বছরেও এই যন্ত্রটি কেনাই সম্ভব হয়নি!
জানা যায়, মূল যন্ত্র কেনার জন্য দুইবার আন্তর্জাতিক দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করা হলেও তা বাতিল হয়ে যায়। বর্তমানে তৃতীয়বারের মতো দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ মূল যন্ত্রই যদি না থাকে, তবে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বানানো এক্সেল লোড স্টেশনগুলো চলবে কীভাবে?
সরকারি বিধিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, ৫০ কোটি টাকার ওপরের বাজেটের প্রকল্পে একজন পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক (পিডি) থাকা বাধ্যতামূলক। অথচ ১৬০৯ কোটি টাকার এই প্রকল্পে শুরু থেকেই কোনো পূর্ণকালীন পিডি নেই।
গত ৭ বছরে চারবার পিডি বদল হয়েছেন। বর্তমানে প্রকল্প পরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন সওজ-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কে. এম. নূর-ই-আলম। বিশাল এই কর্মযজ্ঞে ২১টি জেলায় কাজ তদারকির জন্য কারিগরি জনবল রয়েছেন মাত্র ৩ জন! বিস্ময়কর ব্যাপার হলো তারা প্রত্যেকেই অন্য দফতরের কাজ সামলে এখানে ‘অতিরিক্ত দায়িত্ব’ পালন করছেন।
প্রকল্পের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল ভূমি অধিগ্রহণ। কিন্তু ১৭টি এল.এ কেসের (ভূমি অধিগ্রহণ মামলা) মধ্যে মাত্র ৬টির কাজ শেষ হয়েছে। সময়মতো জমি না পাওয়ায় ২৫টি কন্ট্রোল স্টেশন নির্মাণের মূল লক্ষ্যমাত্রা থেকে বর্তমানে তা ১৭টিতে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ১০টি স্টেশনের পূর্ত কাজ ৯০ ভাগ শেষ হয়েছে, বাকিগুলোর কাজ এখনো শুরুই করা যায়নি। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রায় ৭ বছর পার হলেও মেগা এই প্রকল্পের এখনো কোনো সরকারি অডিট বা নিরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি।
সরেজমিন পরিদর্শনে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। অনেক অসাধু চালক বর্তমানে বিদ্যমান স্কেলগুলোকে ফাঁকি দিতে অভিনব কৌশল অবলম্বন করছেন। ট্রাকে অতিরিক্ত এক্সেল (চাকা) সংযোজন করে তারা ওজন সীমার মধ্যে স্কেল পার হচ্ছেন। স্কেল পার হওয়ার পরই লিভার টেনে অতিরিক্ত চাকাগুলো শূন্যে তুলে মহাসড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। অথচ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পের ডিজাইনে এ ধরনের অভিনব জালিয়াতি রোধের কোনো কার্যকর ব্যবস্থারই উল্লেখ নেই! ফলে ভবিষ্যতে পুরো বিনিয়োগই ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রকল্পটির এই বেহাল দশা নিয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যালোচনা প্রতিবেদনে চরম হতাশার চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই প্রকল্পের নকশা ও প্রাক্কলন প্রণয়নে চরম দূরদর্শিতার অভাব ছিল।
এ বিষয়ে বর্তমান প্রকল্প পরিচালক (পিডি) সওজ-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কে. এম. নূর-ই-আলম বলেন, আন্তর্জাতিক দরপত্র মূল্যায়নে কিছু কারিগরি জটিলতা এবং বিগত বছরগুলোতে বৈশ্বিক সংকটের কারণে প্রকল্পের কাজে অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব হয়েছে। তবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ওয়ে ইন মোশন যন্ত্রগুলো সংগ্রহের জন্য তৃতীয়বারের মতো দরপত্র প্রক্রিয়ার কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসেছি। ভূমি অধিগ্রহণের সমস্যাগুলোও সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমাধানের জোর চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হলো এই মহাসড়কগুলো। হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্প যদি সঠিক সময়ে এবং ত্রুটিমুক্তভাবে বাস্তবায়ন করা না যায়, তবে ওভারলোডেড ট্রাকের কারণে মহাসড়কগুলোর যে বিপুল ক্ষতি হচ্ছে, তা কোনোভাবেই ঠেকানো সম্ভব হবে না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত কালক্ষেপণ না করে দ্রুত এই প্রকল্পের প্রশাসনিক ও কারিগরি বাধাগুলো দূর করে তা আলোর মুখ দেখানো।