দখল, দূষণ ও পলি জমে নাব্যতা সংকটে পড়া ঐতিহ্যবাহী ব্রহ্মপুত্র নদকে রক্ষা এবং এর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবিদ, নদী গবেষক ও পরিবেশকর্মীরা। একই সঙ্গে নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদ, দূষণের উৎস বন্ধ, সীমানা নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় স্থানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খননের দাবি জানান তারা।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার লাঙ্গলবন্দ রাজঘাট থেকে নৌপথে ব্রহ্মপুত্র নদ পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচি শুরু হয়। পরে নৌযানে করে সোনারগাঁও উপজেলার জামপুর ইউনিয়ন হয়ে বন্দর উপজেলার সাব্দী এলাকা পর্যন্ত নদীর বিভিন্ন অংশ সরেজমিনে পরিদর্শন করেন পরিবেশবিদ, নদী গবেষক, সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
পরিদর্শনকালে নদীর বর্তমান অবস্থা, নাব্যতা, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ, তীরবর্তী পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং নদীকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা পর্যবেক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি নদীর বিভিন্ন সংকট চিহ্নিত করে তা থেকে উত্তরণের উপায় নিয়েও আলোচনা করেন অংশগ্রহণকারীরা।
নদী পরিদর্শন কর্মসূচির আয়োজক ও সংগঠক হিসেবে ছিল বাংলাদেশ নদী ফাউন্ডেশন, পরিবেশ ও নদী রক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশন এবং পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটি। কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির প্রতিনিধিত্বকারী আয়োজকরা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ নদী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. মনির, নোঙর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সুমন শামস এবং পরিবেশ ও নদী রক্ষা উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এইচ এম সুমন। কর্মসূচির উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তাপশ কর্মকার ও শিপন সরকার, সাংবাদিক পনির ভূঁইয়া স্টার নিউজ ও ডেইলি সানের সাংবাদিক এস এম শাহাদাত, মনির হোসেন।
এ ছাড়া পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন সোসাইটির পরিচালক ইয়ামিন ভূইয়াসহ ফজলুল হক ভূইয়া, মান্নান ভূইয়া, রফিকুল ইসলাম, আলাউদ্দিন, বেলাল হোসেন, মোসলেহ উদ্দীন, খাইরুল কবির লাল ও তরিকুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক, পরিবেশকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন।
বক্তারা বলেন, নদী দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি, কৃষি, নৌ-যোগাযোগ ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। দীর্ঘদিনের দখল, দূষণ, অপরিকল্পিত স্থাপনা ও পলি জমার কারণে ব্রহ্মপুত্রসহ দেশের অনেক নদী অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
তারা বলেন, ব্রহ্মপুত্রকে রক্ষা করতে হলে প্রথমে নদীর সীমানা নির্ধারণ ও সংরক্ষণ করতে হবে। পাশাপাশি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, দূষণের উৎস বন্ধ এবং প্রয়োজনীয় স্থানে বৈজ্ঞানিকভাবে নদী খননের উদ্যোগ নিতে হবে। নদীতীরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায়ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা আরও বলেন, শুধু নদী দিবস পালন বা আলোচনা সভার মধ্যে নদী রক্ষা কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। নদীর প্রকৃত অবস্থা জানতে নিয়মিত সরেজমিন পরিদর্শন, তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণার পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, পরিবেশ সংগঠন ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
নদী পরিদর্শন শেষে আয়োজকরা বলেন, ব্রহ্মপুত্র শুধু একটি জলধারা নয়; নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁও ও আশপাশের জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, পরিবেশ ও মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নদীটির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই ব্রহ্মপুত্রকে দখল ও দূষণমুক্ত করে এর নাব্যতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
নদী রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজকরা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে ব্রহ্মপুত্রসহ নারায়ণগঞ্জের অন্যান্য নদ-নদীর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আরও সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও জনসম্পৃক্ত কর্মসূচি পরিচালনার ঘোষণা দেন তারা।