ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলরের অফিসের স্টাফ মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি আমলাদের পদায়ন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি ব্যাংকে চাকুরি প্রদানের আশ্বাস দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে তিনি এই টাকা আত্মসাৎ করেছেন। প্রতারণার শিকার হওয়া ভুক্তভোগীরা মাসুদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও অভিযোগ দায়ের করবেন বলে জানিয়েছেন।
জানা যায়, মাসুদের এই চাকুরি প্রদানের প্রতারণার অন্যতম অবলম্বন ছিল সরকারি বা বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকে চাকুরি প্রদান। তিনি ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা চুক্তি করতেন এসব চাকুরি দেওয়ার জন্য। চাকুরির লিখিত, মৌখিকসহ সকল পরীক্ষায় তিনি উত্তির্ণ করে দেওয়ার চুক্তি করতেন। চুক্তি মোতাবেক মাসুদ ২ থেকে ৩ লাখ টাকা অগ্রীম ও চাকুরি নিশ্চিত হয়ে গেলে বাকি টাকা দিতে হবে এই মর্মে ব্যাংক চেক নিতেন। মাসুদ যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কার্যালয়ের কর্মচারী তাই কেউই তাকে অগ্রীম টাকা দিতে বা ব্যাংক চেক দিতে দ্বিধা করেনি। এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে দুই শতাধিক লোকের কাছ থেকে চাকুরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক কোটি টাকা। অগ্রীম টাকা নেওয়ার পর থেকেই মাসুদ আজকে সরকারি ব্যাংকের চাকুরি, কালকে বেসরকারি ব্যাংকের চাকুরি হয়ে যাচ্ছে বা প্রক্রিয়া চলমান বলে কালক্ষেপণ করতে থাকেন। এমনকি মাসুদ ট্রাস্ট ব্যাংকের চাকুরি নিশ্চিত পাইয়ে দিবেন বলেও আশ্বাস দেন ভুক্তভোগীদের। ভুক্তভোগীরা অধৈর্য হয়ে টাকা ফেরত চাইলে মাসুদ প্রতি মাসেই তাদের টাকা ফেরত দিয়ে দিবেন বলে তারিখ দিয়ে আরেক দফা সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন কিন্তু টাকা ফেরত দেন না।
আরো জানা যায়, মাসুদ সরকারি আমলাদেরকেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করার দায়িত্বও নিয়ে থাকেন। তিনি একজন সচিবের পদায়নের জন্য মন্ত্রণালয় ভেদে ২ কোটি টাকা থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত চুক্তি করে থাকেন। এই সকল চুক্তি করার জন্য তিনি বিভিন্ন নামীদামী রেস্তোরায় বৈঠক করতেন। মাসুদ পদায়ন বা চাকুরি দেওয়ার কাজে সারাদিন ব্যস্ত থাকেন দেখিয়ে সন্ধ্যায় এসব রেস্তোরায় বসার জন্য সময় ঠিক করতেন। কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, মাসুদ নিজে ভিসি কার্যালয়ের একজন সাধারণ কর্মচারি। একজন কর্মচারি কিভাবে আমলাদের পদায়নেরও ঠিকা নেয় এটা বোধগম্য নয়। মাসুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কার্যালয়ের কোনো বড় কর্মকর্তাকে ধরে হয়ত ব্যাংকের চাকুরির ব্যবস্থা করে দিতে পারেন কিন্তু যখন শুনেছি তিনি আমলাদের পদায়নের ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যও চুক্তি করেন তখনই বুঝেছি যে আমি প্রতারণার ফাঁদে পরেছি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কার্যালয়ের নাম ভাঙ্গিয়েই এই টাকা আত্মসাৎ করছেন। তারা আরো বলেন, আমরা টাকা ফেরত চেয়েছি কিন্তু মাসুদ ফেরত দিচ্ছেন না। এখন আমরা দুদকে অভিযোগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
কয়েকজন ভুক্তভোগী আরো জানান যে, মাসুদ সরকারি বিভিন্ন অধিদপ্তরের ঠিকাদারির কাজ দেওয়ারও চুক্তি করে থাকেন। তিনি বালু সাপ্লাইসহ বিভিন্ন কন্সট্রাকশনের ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য একটা কমিশন দাবি করে থাকেন। কমিশনের পরিমাণ নির্ভর করে ঠিকাদারি কাজের মূল মূল্যের উপর। মাসুদ যে অধিদপ্তরের কাজ দিবেন সেই অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবি করা কমিশনের উপর নিজের জন্য ২ থেকে ৩ শতাংশ কমিশন নিয়ে থাকে বলেও জানা যায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মাসুদ এই কাজগুলো করেছেন পতিত আওয়ামী লীগের দলীয় নেতাকর্মীদের ক্ষমতায়। তাদের একটা কমিশন দিয়ে নিজে বাকি টাকা আত্মসাৎ করতেন। এখনো তিনি সেই নেতাকর্মীদের সাথে সখ্যতা বজায় রেখেছেন বলেও জানা যায়। বিভিন্ন সূত্র জানায়, মাসুদ পলাতক আওয়ামী নেতাদের পরিবারের দেখাশুনা করেন নিয়মিত। বাসার বাজার থেকে শুরু করে সার্বিক কাজও করে থাকেন মাসুদ।
এসব বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কার্যালয়ের স্টাফ মো. মাসুদ রানার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। কিন্তু তিনি বলেন যে ব্যাংকে চাকুরি দেওয়ার কোন বিষয় এখানে নেই। যে টাকা পাবে সেটা ব্যবসায়িক লেনদেন অন্য কিছু না। এই বলে তিনি মুঠো ফোন সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করে দেন। তাকে আমলাদের পদায়নসহ ঠিকাদারি কাজের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করার জন্য এরপর একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন কল রিসিভ করেননি। পরে তাকে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও কোনো প্রতিউত্তর দেননি।