রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বিতর্কিত ও দলীয় সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আলোচনা চললেও গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই /এম ঢাকা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক এখনও বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন।
ইতিমধ্যে তার বিরেুদ্ধে টেন্ডার বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে । স্বৈরাচারী পতিত লীগ সরকারের আমলে দাপটের সঙ্গে সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন নিজেকে বিএনপি ঘরানার বলে দাবি করছেন তিনি। শেখ হাসিনা সরকারের সময় নিজেকে আওয়ামীপন্থী প্রমাণ করে দীর্ঘদিন গণপূর্ত অধিদপ্তরে পদ আঁকড়ে ছিলেন।
সরকারি দল, উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে সবসময় নিজেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে রেখেছেন। জানা গেছে, চলতি অর্থবছর ২০২৫–২০২৬-এ জাতীয় বিজয় দিবস উপলক্ষে প্যারেড গ্রাউন্ডে কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানের জন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় ইলেকট্রিক্যাল কাজের বিপরীতে গণপূর্তের ই/এম ঢাকা জোনে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করে। সেই বরাদ্দকৃত ৫ কোটি টাকা তাঁর মনোনীত ঠিকাদারকে গোপন টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ পাইয়ে দিয়ে, নামমাত্র মূল্যে কাজ করিয়ে সমুদয় টাকা আত্মসাৎ করে ভাগাভাগি করে চলেছেন তিনি। সূত্রে আরও জানা যায়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম ঢাকা জোনে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সুবিশাল একটি সিন্ডিকেট। সেই সিন্ডিকেটের আড়ালে গড়ে তোলা তাঁর বাহিনী দ্বারা প্রভাবিত করে টেন্ডার বাণিজ্য, ঘুষের সিন্ডিকেট ও ক্ষমতার বেপরোয়া অপব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও এখনো বহাল তবিয়তে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন দেদারসে। তিনি নিজের পছন্দের ঠিকাদারদের গোপনে স্টিমেট সরবরাহ করে কোটি কোটি টাকার আগাম ১০% কমিশন হাতিয়ে নিচ্ছেন তাঁর মনোনীত ঠিকাদারদের মাধ্যমে। ৫ আগস্ট ২০২৪ গণভবন থেকে পতিত স্বৈরাচারী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান।
পরে উক্ত স্থানটি জুলাই জাদুঘর হিসেবে সংস্কারের জন্য এস্টিমেট, ইলেকট্রিফিকেশন কাজ বাবদ ৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন প্যাকেজ টেন্ডারে ভয়াবহ জালিয়াতির মাধ্যমে আগাম ১০% হারে কমিশন নিয়ে নির্ধারিত অফিস স্টিমেট সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। “সুবরা কনস্ট্রাকশন” নামক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক সুবরা মোস্তফাকে দিয়ে অতি নিম্নমানের ইলেকট্রিক সামগ্রী ব্যবহার করিয়ে তাঁর মনোনীত ঠিকাদারদের সঙ্গে আঁতাত করে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হকের বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের দাবি, ওই প্রতিষ্ঠানকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে আগেই গোপন স্টিমেট সরবরাহ করা হয়েছিল। এভাবেই চলছে ভয়ঙ্কর কমিশন বাণিজ্য ও ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ। বর্তমানে প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক ঢাকা ই/এম সার্কেলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ঘুষের রাজত্ব কায়েম করে চলেছেন তিনি। এখানে তাঁর পছন্দের ঠিকাদার ছাড়া অন্য কেউ সরকারি কাজের টেন্ডারে সুযোগ পাচ্ছেন না বলেই অভিযোগ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, “স্যার একাই যেন রাজা। কেউ তাঁর ‘পারসেন্টেজ সিস্টেম’ না মানলে তাঁদের বদলি বা চাকরি খাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।” সূত্রে আরও জানা গেছে, মিরপুরের পাইকপাড়া সরকারি কলোনির ১৪ তলা বিশিষ্ট ২৪টি ভবনের ৩০০ কোটি টাকার এস্টিমেট ও ইলেকট্রিফিকেশন কাজের বিপরীতে অতিরিক্ত প্রাক্কলন করে বাজারদরের চেয়ে বেশি মূল্য দেখিয়ে তাঁর মনোনীত ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে অতিরিক্ত ১০% হারে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া একইভাবে আজিমপুর সরকারি কলোনির দ্বিতীয় ফেজের ১৬টি ভবনের ২৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ এবং মতিঝিলের সরকারি বাসভবনের এস্টিমেট ও ইলেকট্রিফিকেশন কাজের ২৫০ কোটি টাকার বিপরীতে ঠিকাদারদের মাধ্যমে কার্যাদেশ প্রদান করে ১০% হারে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও ছোটখাটো টেন্ডারের কারসাজি করে গোপন দরপত্র প্রদানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে যে ফ্ল্যাটে তিনি বসবাস করেন সেটির মূল্যও কয়েক কোটি টাকা। তাঁর দেশের বাড়ি নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় কয়েক একর জমি রয়েছে বলে জানা যায়, যা স্ত্রী ও সন্তানদের নামে রয়েছে। ঢাকার অভিজাত এলাকাতেও রয়েছে একাধিক বাড়ি, ফ্ল্যাট ও জমি। স্ত্রী ও সন্তানদের নামে ব্যাংকে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার এফডিআর। অথচ তাঁর সরকারি বেতন ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে এ ধরনের সম্পদের মালিক হওয়া অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে এবং দেশ-বিদেশে বিপুল অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় ও আয়ের মধ্যে কোনো মিল নেই বলে জানিয়েছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা।
এ বিষয়ে জানতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হকের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।