কয়েক বছর ধরেই দেশের শেয়ারবাজারে অস্থিরতা চলছে। এই অস্থিরতার নেপথ্যে যাদের নাম সামনে এসেছে, তাদের একজন মো. মামুন মিয়া। এর আগেও কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে অন্তত ৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে মামুন ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। নতুন সরকারের আমলেও পুঁজিবাজারে ক্ষমতার শক্তিতে পরিণত হয়েছেন তিনি। এর নেপথ্যে রয়েছে প্রভাবশালী মহলের পৃষ্ঠপোষকতা।
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ‘জেড’ ক্যাটাগরির একটি কোম্পানি এমারেল্ড অয়েল ইন্ডিাজট্রিজ লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে আবারও কারসাজি চক্র সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কোনো ধরনের মূল সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই বিগত কয়েক কার্যদিবসে এই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম ও লেনদেন অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।
ডিএসইর বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ১৩ মে থেকে মাত্র সাত কার্যদিবসে শেয়ারের দর ১৬.৬০ টাকা থেকে বেড়ে গত ৪ জুন ৭৪.৭০ টাকায় উন্নীত হয়। অর্থাৎ এই স্বল্প সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারের দর বেড়েছে ৮.১০ টাকা বা ৪৮.৭৯ শতাংশ।
ডিএসই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো দৃশ্যমান ব্যবসায়িক উন্নয়ন, উৎপাদন বৃদ্ধি বা ইতিবাচক খবর ছাড়াই এমন উত্থান ‘অস্বাভাবিক’।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ এবং বড় ধরনের লোকসানে থাকা দুর্বল মৌলভিত্তির এই কোম্পানির আকস্মিক উত্থান সন্দেহজনক। তারা বলছেন, এই বাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আবৃত ফাঁদে ফেলে তার কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি নীল নকশা মাত্র।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২১ সালে জাপানিভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে মেসার্স অ্যাগ্রো আফ্রিন এবং ২০২৪ সালে জাপানি বিনিয়োগ ও জাপানে রান অ্যাগ্রো প্রসেসিং মতো ভূয়া টেক্সটাইল তথা জড়িয়ে বড় ধরনের কারসাজি চালায় মিনোরি বাংলাদেশ। বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এবারও সেই একই চক্র পেছন থেকে কলকাঠি নাড়ছে।
শেয়ারবাজার বিশ্লেষকদের মতে, এমারেল্ড অয়েলের বর্তমান অস্বাভাবিক মুভমেন্ট বুঝতে হলে ২০২৩ সালের কারসাজির ইতিহাস জানা জরুরি।
ওই বছরের ১ এপ্রিল থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত মাত্র তিন মাস ১০ দিনে এমারেল্ড অয়েলের শেয়ারের দর ৩১.৩০ টাকা থেকে বেড়ে সর্বোচ্চ ১১৮.৮০ টাকায় উন্নীত হয়েছিল। এই সময়ে মিনোরি বাংলাদেশ জাপানে কোল্ড স্টোরেজ ব্যবসা লুকিয়ে নানা অভাবনীয় মূল সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) ডিএসইর পোর্টালে প্রকাশ করে। পাশাপাশি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ফান্ড করে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রচার করা হয়।
ব্যবসায়িক আর্থিক প্রতিবেদনে তৈরি করে বন্ধ থাকা কোম্পানিতে কাল্পনিক মুনাফা দেখিয়ে আর্থিক প্রতিবেদনও ঘোষণা করা হয়। এভাবে শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অন্য এক তথ্যে ব্যাপক গুঞ্জন ছড়ানো হয়। আর এর মাধ্যমে মিয়া মামুন ও তার সিন্ডিকেট সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে চড়া মূল্যে শেয়ার বিক্রি করে অন্তত ৩০০ কোটি টাকা বাজার থেকে তুলে নেয়।
এই ওই সময়ে ছয় মাসের মধ্যে শেয়ারের দর ১৮৮ টাকা থেকে ৭ ৪ টাকায় নেমে আসে। পরে কোম্পানির উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও লভ্যাংশের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ পেলে শেয়ারের দর চূড়ান্ত ধস নামে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বার্ষিক আর্থিক বিবরণী প্রকাশের পর পরবর্তী দুই অর্থবছরে আর কোনো বিবরণী প্রকাশ করেনি প্রতিষ্ঠানটি। এ সময়ে কোনো বার্ষিক সাধারণ সভাও (এজিএম) করতে পারেনি এমারেল্ড অয়েল। ফলে ২০২৩ সালের নভেম্বরে শেয়ারের সর্বনিম্ন দর নামে ১০.২০ টাকায়। মিনোরির এই জালিয়াতিতে পুঁজি হারিয়ে সর্বশান্ত হয়ে পথে বসেছে হাজার হাজার সাধারণ বিনিয়োগকারী।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে জানা যায়, মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদফতর (আরজেএসসি) থেকে বাংলাদেশি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে নিবন্ধন পায়। কোম্পানির উদ্যোক্তা ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুন মিয়া বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট, এনআইডি ও টিআইএন ব্যবহার করে নিবন্ধিত হন। অপর উদ্যোক্তা পরিচালক আব্দুল কালাম আজাদও বাংলাদেশি নাগরিক। কাজেই আইনগতভাবে এই কোম্পানির সঙ্গে জাপানের কোনো পুঁজি বা অংশীদারিত্ব ছিল না।
মিনোরি বাংলাদেশকে ‘জাপানি প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে দেখাত মো. মামুন মিয়া। ২০১৬ সালের ৭ জানুয়ারি এনআরবি ব্যাংকের গুলশান শাখায় একটি ব্যাংক হিসাব (হিসাব নম্বরের শেষ চার অক্ষর ৬১১২) খোলেন। অ্যাকাউন্ট খোলার ফর্মে তিনি নিজের প্রকৃত নাম আড়াল করে জাপানি ভাষায় ‘মিয়া মামুন’ (MIYA MAMUN) হিসেবে স্বাক্ষর করেন।
নথি অনুযায়ী, জাপান থেকে মিনোরি বাংলাদেশের অ্যাকাউন্টে প্রথম রেমিট্যান্স আসে ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি। অর্থাৎ ব্যাংক হিসাব খোলার সময় পরিশোধিত মূলধন কোনো জাপানি বিনিয়োগ প্রদর্শনের আইন সুযোগ ছিল না। তা সত্ত্বেও ব্যাংকের নথিতে এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সংশ্লিষ্ট সব নথি ও চিঠিতে মো. মামুন মিয়া তার প্রকৃত নাম গোপন করে জাপানি ভাষায় স্বাক্ষর করতে থাকেন।
২০২২ সালের জুন মাসে এশিয়ান সাবানের ম্যাগাজিনে মিনোরিকে জাপানিজভিত্তিক কোম্পানি হিসেবে দেখিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী এমারেল্ড অয়েলে আগ্রহ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনের মাধ্যমে মিনোরিকে একটি প্রখ্যাত জাপানি কোম্পানি হিসেবে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালানো হয়।
মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড এমারেল্ড অয়েলের ৭.৮ শতাংশ শেয়ার কিনতে ৫ কোটি ২৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা ব্যয় করে। কিন্তু শুধু একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে (এনআরবি ব্যাংক) লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১২ ও ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৯ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিভিন্ন সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ করে।
এই হিসাবে ৪ কোটি ৮৭ লাখ ৭০ হাজার টাকার শেয়ার বিনিয়োগ বার্ষিক আর্থিক বিবরণীতে গোপন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, শেয়ারবাজারের কারসাজির উদ্দেশ্যেই এই বিনিয়োগের কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। বিএসইসির তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ মদদে এনআরবি ব্যাংকে মানি লন্ডারিং ও বিভিন্ন জাল নথি তৈরি করে ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে মিনোরি বাংলাদেশের মোট ৩১ কোটি ৫৬ লাখ টাকার একটি ভুয়া বিনিয়োগ দেখায়। এর বিপরীতে বিএসইসি মিনোরির অনুকূলে ৩ কোটি ১৩ লাখ নতুন শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দেয়।
এই ভুয়া বিনিয়োগকে বৈধতা দিতে মিনোরি অভিপ্রায় প্রকাশ করে ইসলাম অ্যাগ্রো কোল্ড-এবং অর্থনৈতিক সহায়তায় ডায়মন্ড সাথ-সেনা ও শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়। প্রতিটি রিপোর্টে ২০১০-১১ অর্থবছরে শেষে ১০ কোটি ৪৬ লাখ ৯৮ হাজার ১২১ টাকা এবং ২০১১-১২ অর্থবছরের শেষে ১৪ কোটি ৯০ লাখ ৩৮ হাজার ৭ ৩৫ টাকা শেয়ার মানি ডিপোজিট দেখানো হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩৬০ দিনের মধ্যে তা শেয়ার ক্যাপিটালে রূপান্তর করার কথা থাকলেও তার কোনোটিই করা হয়নি।
ভুয়া বিনিয়োগকে বৈধ দেখাতে মিনোরির অডিট রিপোর্টে ‘গোল্ড মন সিটিজ সানিয়ান’ হিসেবে তিনটি কোম্পানি থেকে ২০১১-১২ অর্থবছরে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ২৪ হাজার টাকা ঋণ দেখানো হয়। কিন্তু ওই অর্থবছরে সেই তিনটি কোম্পানির কোনো অস্তিত্বই ছিল না।
শুধু তা-ই নয়, শর্ট টার্ম লোন হিসেবে আরও ২টি প্রোপ্রাইটরশিপ ও তিনটি প্রাইভেট লিমিটেড ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ১ হাজার ৩৭২ টাকার বানোয়াট ঋণ দেখানো হয়েছে। এসব ঋণের স্বপক্ষে কোনো স্যালুটো, ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা অপরাধের টাকা ডিপ্রেশন নেই। আইসিএবি এলগ্রিষ্ঠান ধান দেওয়ার কোনো এখতিয়ারও নেই।
এ ছাড়া জাপানি প্রোপ্রাইটরশিপ প্রতিষ্ঠান মেসার্স লাবিব কর্পোরেশনের মালিক মো. আমজাদ হোসেন নিজেই মিনোরির শেয়ারহোল্ডিং পরিচালক ছিলেন। আইডি ব্যবস্থাপনার আয়কর রিটার্ন রিপোর্টে এ বিষয়ে কোনো ডিসক্লোজার দেওয়া হয়নি।
বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, মিনোরি বাংলাদেশ লিমিটেড মাত্র ২০ লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ২০১৭ থেকে ২০২৬ সালের গত জুন পর্যন্ত টানা চার অর্থবছরে ব্যবসা থেকে মোট মুনাফা ছিল মাত্র ২ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। এই কাগজসর্বস্ব, দুর্বল আর্থিক ভিত্তির কোম্পানি কীভাবে এবং কিসের দরুন ‘জাপানি জায়ান্ট’ হিসেবে পরিচিতি পেল, তা জরুরি ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এত সব জালিয়াতির অপরাধের নিয়ন্ত্রণ সংস্থার নাকের ডগায় বসে আবারও এমারেল্ড অয়েলের শেয়ার নিয়ে মিনোরি তথা মামুন চক্রের বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ব্রোকারেজ হাউসগুলোতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতোমধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীরা এই চক্রের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণ সংস্থার দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মিনোরি বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুন মিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে চেষ্টা করে এশিয়া পোস্ট, কিন্তু তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যবহৃত সাতটি দেশি ও বিদেশি নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়, কিন্তু একটি বাদে সবগুলো নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। একমাত্র সচল নম্বরটিতে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি সাড়া দেননি।
পরে একটি জাপানি নম্বর হোয়াটসঅ্যাপে তাকে মেসেজ দেওয়া হয়। এই নম্বরে যোগাযোগ করলেও তিনি সাড়া দেননি। একই সঙ্গে এই নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো জবাব মেলেনি।
সূত্র: এশিয়া পোস্ট