কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সাংবাদিক এইচ এম মোশারেফ সুজনের ছবি বিকৃত ও অশ্লীলভাবে উপস্থাপন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে। মামলায় পটুয়াখালীর মনিরুল ইসলাম মিঠুকে আসামি করা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা ও ডিজিটাল আলামত যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পটুয়াখালী সিআইডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে মামলার নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
গত ১৭ আগস্ট ২০২৬ মামলাটি দায়ের করেন সাংবাদিক এইচ এম মোশারেফ সুজন। দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতায় যুক্ত বাদীর অভিযোগ, পূর্ববিরোধের জেরে তাকে সামাজিক, ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক ও মানহানিকর প্রচারণা চালানো হয়েছে।
ভুয়া প্রোফাইল খুলে এআই ছবি ছড়ানোর অভিযোগ
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৫ আগস্ট রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে বাদী দেখতে পান, তার নাম ও ছবি ব্যবহার করে একটি ভুয়া ফেসবুক প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। ওই প্রোফাইল থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা নারীর সঙ্গে তার জোড়া ছবি এবং বিভিন্ন মানহানিকর ও বিদ্বেষমূলক ছবি প্রকাশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
বাদীর দাবি, এসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তার ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত সুনাম নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি তার ব্যবহৃত মেসেঞ্জার আইডিতেও বিদ্বেষমূলক ছবি পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা করা হয়েছে বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
জুনেও একই ধরনের ছবি প্রচারের অভিযোগ
মামলার নথিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের জুন মাসেও একই ধরনের কিছু ছবি মনিরুল ইসলাম মিঠুর ব্যবহৃত আইডি থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছিল বলে বাদীর অভিযোগ। এ-সংক্রান্ত পোস্টের স্ক্রিনশট ও সংশ্লিষ্ট লিংক আদালতে দাখিল করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এ কারণে মামলার তদন্তে শুধু কোনো নির্দিষ্ট পোস্ট বা ছবি নয়, সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট, পোস্টের সময়, ব্যবহার করা ডিভাইস এবং ডিজিটাল যোগাযোগের অন্যান্য তথ্য গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক পরীক্ষার নির্দেশ
মামলার নথি অনুযায়ী, অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রয়োজনীয় ডিভাইস জব্দ করে ফরেনসিক বিশ্লেষণের ব্যবস্থা নিতে পটুয়াখালী সিআইডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ছবি বা কনটেন্টগুলো কোথা থেকে তৈরি, কোন ডিভাইস বা অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে এবং এগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কীভাবে ছড়িয়েছে—এসব বিষয়ে প্রযুক্তিগত তথ্য যাচাই করা হবে।
বাদীপক্ষের আইনজীবী মো. আবু বকর সিদ্দিক হাওলাদার জানান, মামলাটি সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ১৭, ২৫, ২৬ ও ৩০ ধারাসহ প্রযোজ্য ধারায় করা হয়েছে। ডিজিটাল আলামত জব্দ ও ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আদালতের নির্দেশনা রয়েছে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন
সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও ছবি বিকৃত, অশ্লীল বা বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া এখন শুধু ব্যক্তিগত হয়রানির বিষয় নয়; এটি সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অপপ্রচারের গুরুতর দৃষ্টান্ত হতে পারে।
বিশেষ করে কোনো সাংবাদিককে পেশাগতভাবে চাপে রাখা, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা তার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে প্রযুক্তির অপব্যবহার করা হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তদন্তেই বের হবে প্রকৃত রহস্য
তবে মামলায় আনা অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত মনিরুল ইসলাম মিঠুর বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলো সত্য কি না এবং কথিত এআই-নির্মিত ছবি বা পোস্টের সঙ্গে আসামির সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তা তদন্তের আগে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
এখন সিআইডির প্রযুক্তিগত তদন্তেই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলতে পারে—ছবিগুলো কোথায় তৈরি হয়েছে, কার ডিভাইস থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপলোড করা হয়েছে, ভুয়া প্রোফাইলটি কে পরিচালনা করেছে এবং জুন ও আগস্টের কথিত প্রচারণার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না।
মামলার নথি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, পোস্ট, ছবি, লিংক ও ডিজিটাল ডিভাইসের ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদঘাটনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে।