বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬, ০৭:৫৪ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
কামিল পাস করেও চাকরির অপেক্ষা নয়, ফাস্টফুড ব্যবসায় সফল শারমিন আমতলীতে বস্তাবন্দি অজ্ঞাত যুবকের লাশ উদ্ধার জনতা ব্যাংক পিএলসি নান্দাইল রোড বাজার শাখা স্থানান্তরের চেষ্টার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ : ১০১ বিশিষ্ট নাগরিকের উদ্বেগ তাড়াইল সদর ইউনিয়নে দুঃসময়ের সুহৃদ সাথী নূরে আলম সিদ্দিকী বিআইডব্লিউটিএ’র যুগ্ম-পরিচালক মাহফুজ উল আলমের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি ও কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী এমপির উদ্যোগে অতিরিক্ত ১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বরাদ্দ পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় সক্রিয় ছিনতাই চক্রের তিন সদস্য গ্রেপ্তার বদলি আদেশ গায়েব করে এক যুগ ধরে সিএফ কার্যালয়ে হিসাবরক্ষক ইউছুপ: ৯ ডিভিশন থেকে মাসোহারা ও কোটি টাকার বদলি বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য বিসিএসআইআর স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ

সুবিদখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ আছাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ

বিশেষ প্রতিনিধি:
  • আপলোডের সময় : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬
  • ৫৮৬৭ বার পঠিত
সনদ জালিয়াতি থেকে কোটি টাকার অনিয়ম আছাদুজ্জামানের।

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজ-এ দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, সনদ জালিয়াতি ও আর্থিক দুর্নীতির বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে কলেজটির উপাধ্যক্ষ মোঃ আছাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে নিয়োগ জালিয়াতি, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, হিসাব গরমিল, টিউশন ফি আত্মসাৎ, ভুয়া ব্যয় দেখানোসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব ঘটনায় শিক্ষা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

শিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষা পরিদর্শক মাহমুদুল হাসান, সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম এবং অডিট অফিসার চন্দন কুমার দেব গত ২৮ ও ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে কলেজটি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা করেন। পরবর্তীতে প্রকাশিত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে কলেজটির বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়মের বিস্তারিত চিত্র উঠে আসে।

এমএসসি ফল প্রকাশের আগেই নিয়োগ!

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, মোঃ আছাদুজ্জামান ৮ই জুন ১৯৯৭ সালে জীববিদ্যা বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু নিয়োগ সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, আবেদন করার সময় তার এমএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়নি। আবেদনপত্রে তিনি নিজেই “ফলাফল অপ্রকাশিত” উল্লেখ করেন।

বিধি অনুযায়ী চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়া আবেদন গ্রহণযোগ্য না হলেও রহস্যজনকভাবে তার আবেদন বাতিল করা হয়নি। বরং তৎকালীন গভর্নিং বডির যোগসাজশে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে ১ জানুয়ারি ২০১১ সালে উপাধ্যক্ষ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রভাষক পদে নিয়োগই যেখানে বিধিসম্মত হয়নি, সেখানে উপাধ্যক্ষ পদে আবেদনও বাতিলযোগ্য ছিল। কিন্তু তা না করে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

অবৈধ নিয়োগে ৬৮ লাখ টাকার বেতন গ্রহণ!

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রভাষক হিসেবে ১ আগস্ট ১৯৯৭ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০১০ পর্যন্ত তিনি ১০ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৭ টাকা এবং উপাধ্যক্ষ হিসেবে ১ জানুয়ারি ২০১১ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত ৫৭ লাখ ৭৯ হাজার ৬৫০ টাকা বেতন-ভাতা গ্রহণ করেন।

সব মিলিয়ে ৬৮ লাখ ৫ হাজার ৪৯৭ টাকা সরকারি অর্থ গ্রহণের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে এই অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে তার বেতন-ভাতা বন্ধের সুপারিশও করা হয়।

অবৈধ টাকায় পুটয়াখালী শহরে কোটি টাকার আলীশান বাড়ি।

টিউশন ফি জমা হয়নি সরকারি কোষাগারে!

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১২ আগস্ট ২০১৮ তারিখের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে কলেজটি সরকারিকরণ করা হয়। বিধি অনুযায়ী ওই সময় থেকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত টিউশন ফি সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও দীর্ঘ সময় তা জমা হয়নি।

নিরীক্ষায় দেখা যায়, ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৪০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হলেও পূর্ববর্তী বছরের টিউশন ফির অর্থ জমা হয়নি।

এ বিষয়ে উপাধ্যক্ষ আছাদুজ্জামান নিরীক্ষক দলকে জানান, “টাকা কলেজ তহবিলে সংরক্ষিত রয়েছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছি।” তবে নিরীক্ষকরা তার বক্তব্যে সন্তুষ্ট হতে পারেননি।

বোর্ডের ফেরত দেওয়া টাকাও পেল না শিক্ষার্থীরা!

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উচ্চ মাধ্যমিক বোর্ড পরীক্ষা-২০২০ এর ফরম পূরণ ফি বাবদ শিক্ষা বোর্ড থেকে ফেরত পাওয়া ১ লাখ ৩৮ হাজার ২৪০ টাকা ক্যাশ বইয়ে আয় হিসেবে দেখানো হলেও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেই অর্থ ফেরত বা বিতরণ করা হয়নি।

এছাড়া কলেজ সরকারিকরণের সময় ডিড অব গিফটে উল্লেখিত ২৭ লাখ ৭৬ হাজার ৬৪৩ টাকা ২১ পয়সা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষিত থাকার কথা থাকলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও আনা হয়েছে।

ক্যাশ বইয়ে আয়, ব্যাংকে জমার তথ্য নেই!

নিরীক্ষায় কলেজের ক্যাশ বই ও ব্যাংক হিসাব পর্যালোচনা করে একাধিক অসঙ্গতি পাওয়া যায়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬-২০১৭ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায়কৃত ১ লাখ টাকা ক্যাশ বইয়ে আয় হিসেবে দেখানো হলেও ব্যাংকে জমার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

একইভাবে ১৪ জুন ২০১৭ তারিখে ছাত্র বেতন বাবদ আদায়কৃত ৮৫ হাজার ১০০ টাকাও ব্যাংকে জমা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এছাড়া সোনালী সেবা ফি বাবদ আদায়কৃত অর্থ এবং ব্যয়ের হিসাবেও গরমিল পাওয়া গেছে। প্রশংসাপত্র ফি বাবদ আদায়কৃত ৫৩ হাজার টাকা ক্যাশ বইয়ে দেখানো হলেও ব্যাংকে জমার কোনো তথ্য মেলেনি।

ভুয়া ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ!

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনার্স প্রথম বর্ষ পরীক্ষার ফি থেকে ৫ লাখ ১ হাজার ১৭৫ টাকা নির্মাণ কাজে ব্যয়ের তথ্য দেখানো হলেও সংশ্লিষ্ট খাতের সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি।

গভর্নিং বডির সভা, সম্মানী ভাতা, আপ্যায়ন বিল ও যাতায়াত ব্যয়ের ক্ষেত্রেও যথাযথ ভাউচার ও নথিপত্র উপস্থাপন করতে পারেনি কলেজ কর্তৃপক্ষ।

করোনাকালীন লকডাউনের সময়ও পুকুরপাড় সংস্কার, মেহমান আপ্যায়ন ও অন্যান্য খাতে ব্যয়ের তথ্য দেখানো হয়েছে। তবে সেই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিরীক্ষকরা।

গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র গোপনের অভিযোগ!

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ভর্তি, ফরম পূরণ, টিউশন ফি, পরীক্ষার আয়-ব্যয়ের রেজিস্টার, রশিদ ও বিভিন্ন আর্থিক নথিপত্র নিরীক্ষক দলকে দেখানো হয়নি। পরে সরবরাহ করার কথা বলা হলেও সেগুলো জমা দেওয়া হয়নি।

সাবেক ধর্ম মন্ত্রী পটুয়াখালী ১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত অ্যাড. শাহজাহান মিয়ার সাথে আছাদুজ্জামান।আওয়ামীলীগের শাসনামলে সাবেক ধর্ম মন্ত্রী পটুয়াখালী ১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত অ্যাড. শাহজাহান মিয়ার ভাতিজা পরিচয় দিয়ে কলেজে রাম-রাজত্ব কায়েম করেন।

যা বলছেন অভিযুক্ত উপাধ্যক্ষ!

অভিযোগের বিষয়ে উপাধ্যক্ষ মোঃ আছাদুজ্জামান বলেন, “কিছু অর্থ কলেজ তহবিলে সংরক্ষিত রয়েছে। অনেক বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লিখিত অনিয়ম ও আর্থিক অসঙ্গতি নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

সংশ্লিষ্টরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।  শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর অডিট কমপ্লেক্স কর্তৃক  ৮ জানুয়ারি ২০২৬  তারিখে আসাদুজ্জানের বিরুদ্ধে প্রায় ৫ কোটি টাকা দুর্নীতির প্রমান পেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পত্র পেরন করেন।

এ ছাড়াও সুবিদখালী সরকারি ডিগ্রী কলেজের একাধিক শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সনদ জালিয়াতি, বয়স কারসাজি এবং বিভিন্ন ধরনের জালিয়াতি নিয়ে আমাদের অনুসন্ধান চলমান। যা নিয়ে বিস্তারিত থাকছে  ২য় পর্বে।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..