মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:৪২ অপরাহ্ন

বিআইডব্লিউটিএ নিয়োগ পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিনিধি:
  • আপলোডের সময় : শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬
  • ৫৭৮১ বার পঠিত

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর অধীনে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, ওই দপ্তরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগ বাণিজ্য করে আসছে। তারা আগে থেকেই নিজেদের মনোনীত প্রার্থীদের কাছে পরীক্ষার প্রশ্ন পৌঁছে দিয়ে লিখিত পরীক্ষায় পাস করিয়ে নেয়। পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন হওয়ায় এ ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

সূত্রমতে, জনপ্রতি ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরি দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যদিও নিয়ম অনুযায়ী মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ হওয়ার কথা, তবে নিয়োগ কমিটির দাবি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, গত ১৬ মে মিরপুর বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বালক-বালিকা শাখা) এবং মিরপুর গার্লস আইডিয়াল কলেজে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদে নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল ৩টা থেকে ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত পরীক্ষা চলার কথা থাকলেও পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, একটি সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের মনোনীত প্রার্থীদের হাতে প্রশ্নপত্র তুলে দেয়। পরে প্রশ্নের উত্তরপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়।

তবে নিয়োগ কমিটির দাবি, পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্ব তাদের নয়; এটি পরিচালনা করেছে মেরিডিয়ান ইউনিভার্সিটি। যদিও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে উদাসীনতা দেখাচ্ছে এবং অভিযোগগুলো আমলে নিতে অনাগ্রহী।

ভুক্তভোগীরা নৌ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও নৌ উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করে ১৯৯০ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

জানা যায়, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি-০৩/২০২৫ অনুযায়ী বিআইডব্লিউটিএতে ২১ জন লস্কর, ১ জন বাস হেলপার, ২৩ জন শুল্ক প্রহরী, ৬ জন মার্কম্যান, ১৩ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং ২ জন ড্রাইভার নিয়োগের কথা রয়েছে। ১৯৯০ সালের নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী এসব পদের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

নিয়োগ বিধির ২৩ অনুচ্ছেদে এমএলএম, গার্ড, নাইট গার্ড, শুল্ক প্রহরী, এস্টেট প্রহরী, মালি, বেয়ারা, ঝাড়ুদার, গুদাম সহকারী, ক্লিনার, হেলপার, কয়লাঘাট মেসেঞ্জারসহ বিভিন্ন পদে অষ্টম শ্রেণি পাস এবং মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের কথা উল্লেখ রয়েছে।

২০২৫ সালে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নিয়োগ নিয়ে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিআইডব্লিউটিএ শ্রমিক লীগের এক সাবেক নেতাসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলা থেকে লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, লিখিত পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র সরবরাহ করা হয়েছিল। পরীক্ষার্থীদের ছবি ও স্বাক্ষর যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি, ফলে ভুয়া পরীক্ষার্থী বা ‘বডি চেঞ্জ’ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। পাশাপাশি মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে।

তাদের মতে, যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে তাদের আবার একই প্রশ্নে পরীক্ষা নিলে অধিকাংশই ন্যূনতম নম্বরও পাবে না। এছাড়া কিছু প্রার্থীকে নির্ধারিত কেন্দ্রের বাইরেও পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

বিআইডব্লিউটিএর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অতীতেও বিভিন্ন নিয়োগে অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে। একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট কয়েক ধাপে এই অনিয়ম পরিচালনা করে। প্রথমে চাকরির নিশ্চয়তা দিয়ে অর্থ লেনদেন হয়, এরপর লিখিত পরীক্ষা, ব্যবহারিক পরীক্ষা ও মৌখিক পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপে প্রকৃত প্রার্থীর পরিবর্তে ভুয়া প্রার্থী অংশ নেয়। পুরো প্রক্রিয়ায় বিপুল অর্থ লেনদেন হয় বলে তিনি দাবি করেন।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, একটি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও সুশাসন অনেকাংশে নির্ভর করে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার ওপর। তাই বিআইডব্লিউটিএর মতো প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

ভুক্তভোগীরা উত্তরপত্র, হাজিরা শিট, পরীক্ষার্থীদের স্বাক্ষর এবং পরীক্ষকদের স্বাক্ষর যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন। একই ব্যক্তির হাতের লেখা একাধিক উত্তরপত্রে আছে কি না, উত্তরপত্রে পরীক্ষার্থীর স্বাক্ষর মিলছে কি না, তা তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে।

পরীক্ষার্থীদের পরিবারও অভিযোগ করেছে যে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এবং লাখ লাখ টাকার নিয়োগ বাণিজ্য হয়েছে। তারা পরীক্ষা বাতিল করে নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে নিয়োগ কমিটির আহ্বায়ক মো. সাজেদুর রহমান বলেন, “পরীক্ষা নিয়েছে মেরিডিয়ান ইউনিভার্সিটি। খাতা মূল্যায়নও তারাই করেছে। আমাদের হাতে প্রশ্নপত্র ছিল না, তাই প্রশ্নফাঁসের সুযোগ নেই।” তিনি আরও বলেন, কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমেই নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে।

দয়া করে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর..